ফাইনালের বিকেল – (২)

বিদ্যাপীঠের সবচেয়ে অদ্ভুত ম্যাজিক যদি হয় বিদ্যাপীঠের আকাশ, তাহলে সেই আকাশের সবচেয়ে মায়াবী প্রহর ছিল বিদ্যাপীঠের রাত।

মাঠ এক জিনিস, প্রান্তর আর এক। মাঠ কখন রূপোলি ধুলো মেখে প্রান্তর হয়ে যায়, সেই ম্যাজিক দেখতাম রাতে, যখন বিদ্যাপীঠের এপার-ওপার আকাশে সমুদ্রের মতো জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পূর্ণিমার চাঁদ উঠত।

আকাশ যেন আর শামিয়ানা নেই, চাঁদের আলো থইথই করছে কালো জলের মতো, মাইল মাইল দূরের স্বপ্নের দেশ অবধি যেন দেখা যায় সেই আলোর ওপারে। গাছেরা নিস্তব্ধ চুপ, জোছনা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে মাঠের পাশে। সারদা মন্দিরের চূড়ায় ফুটফুটে আলো পতাকার মতো লুটোপুটি খাচ্ছে, বকুলগাছের প্রতিটা পাতা আধ্‌ধেক ছায়া হয়ে থেমে আছে, কী ভেবে বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে চাঁদনি মেখে ওয়াল্টার ডি লা মেয়ারের কবিতা হয়ে গেছে বিদ্যাপীঠ।

আর কোনো রাতে জোছনার আকাশে ভেসে পড়ত ছেঁড়া চিঠির মতো এক টুকরো মেঘ। চাঁদের গায়ে নয়, চাঁদ থেকে একটু দূরে, খসে পড়া পুরোনোর মতো থমকে থাকত। উস্কোখুস্কো প্রান্তে ফ্যাকাসে রামধনুর দাগ। আস্তে আস্তে কেমন যেন ছড়িয়ে গিয়ে মিলিয়ে যেত আকাশের গায়ে। দূর থেকে উঠে আসত ছোটো আরেকটা মেঘের ঝাঁক।

সেরকম একদিন। ভজন শেষ হয়েছে, আমরা বেরিয়েছি লাইন দিয়ে, চটি পরে এবার স্টাডি। আমি, বেরা, মাইতি, সুতনু, ভজনহলেও কাছাকাছি বসতাম। একসাথে গল্প করতে করতে ফিরি।

তখন বিদ্যাপীঠের দক্ষিণে বেশ খানিকটা জায়গা নতুন দখল করা হয়েছে। সারাদিন সেখানে ডিগিং চলে, ডোজার চলে। মাটি খোঁড়া হয় ওদিকের একটা পুকুরের ধারের উঁচু ডাঙা থেকে, সেই মাটি এনে ফেলে এই লাগোয়া জমিতে। আগে ক্ষেত ছিল, ক্ষেতের লেভেল বিদ্যাপীঠের জমির থেকে বেশ নীচুতে। সেটায় মাটি ফেলে, তুলে সমান করা হবে। আর ওদিকে মাটি কাটা হয়ে একটা প্লেন রাস্তা মতো হবে, তাতে নাকি বাইরের গ্রামের লোকজনের সুবিধা হবে। এদিকে এই নতুন জায়গাটায় বিদ্যাপীঠ কী যেন বানাবে। শোনা যাচ্ছে পার্ক হবে। তখন দু’হাজার ছয়, আমরা বিদ্যাপীঠের সেই ‘অধিকৃত কৃষিক্ষেত্র’-টার নাম দিয়েছি ‘সিঙ্গুর’।

আমরা বেরিয়েছি ভজন থেকে, নিবেদিতা কলামন্দিরের কাছাকাছি এসেছি। এবার সোজা চলে যেতে হবে ডানদিকে, গিয়ে ধুতিপাঞ্জাবী ছেড়ে এক মনে স্টাডিহল। সবাই সেটাই করবে, কড়া নিয়ম এবং তার চেয়েও বেশী – নিজের টেনশন, কী কী রিভাইজ দিতে হবে।

আমি বেরিয়ে দেখলাম, ঈস, যা তা অবস্থা। অর্জুনগাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে আকাশে চাঁদ উঠে ফটফট করছে, সাদা সাদা রাংতার মতো মেঘের ফালি দেখা যাচ্ছে। আলোয় ভেসে গেছে। মাইতি চটি পরে আসতেই আমি বললাম, এ, আজকের চাঁদটা দ্যাখ??

বেরা আর সুতনু এলো, ওদেরকেও ব্যাপারটা সম্পর্কে সচেতন করা হল। আমরা মাঝে মাঝে হয়তো হালকা বলাবলি করতাম, বিদ্যাপীঠের ক্যাম্পাসটা রাতে কখনো ঘোরা যায় না রে, গেলে ব্যাপক হত। তো সেই সেদিন সেইখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ প্রস্তাব হল, ‘এই… যাবি?’
আমরা চারজন চারজনের মুখের দিকে তাকালাম। বুঝলাম চারজনেই বদ্ধ পাগল। নিশ্চিন্ত দাঁত বার করে কেলিয়ে দিলাম!

প্রি-টেস্ট হয়ে গেছে, আর পনেরো-না-কুড়ি দিন পরে টেস্ট। সবাই, সব্বাই – পড়াশোনায় লাগাম টাইট করে ব্যস্ত। এমনকী যারা প্রেম করছে তারা অবধি স্টাডিটাইমে যতটা পারে মন দ্যায়। এই হেন চূড়ান্ত সময়ে, আমরা চারজন রাজী হয়ে ঠিক করলাম, সন্ধেবেলা স্টাডিটাইম নষ্ট করে মাঠের ধারে জ্যোৎস্না এনজয় করতে যাব।

জিনিসটায় ধরা পড়লে কতরকম বাঁশ খাব তা ধারণাও নেই। লজ্জা, তিরস্কার, আগাপাশতলা ঝাড় আর মার, গার্জেন কল, কী না হতে পারে। আর ধরা পড়ার চান্স শতকরা আশি ভাগ। সব স্যাররা সবাইকে চেনে, একটু খটকা লাগলেই ক্রস চেক করতে পারে যারা স্টাডিতে নেই তারা কোথায়। কিন্তু..কিন্তু নাহ, করবে না নিশ্চয়ই? কখনো করে না তো! কে আর করে! জাস্ট ধরা না পড়লেই হল।

ধরা না পড়া মানে খুব পরিষ্কার। বিকেলে প্লেটাইম ওভারের পর থেকে বিশাল মাঠ পুরো ফাঁকা পড়ে থাকে। তার মাঝে কেউ দাঁড়ালে ওরকম জোছনা রাতে একমাইল দূর থেকে পরিষ্কার দেখা যাবে। ছায়া আছে এদিকে সেদিকে, মিলিটারী দক্ষতায় তার গায়ে গা মিলিয়ে ঝোপের আড়ালে আবডালে গুটি মেরে শব্দ না করে, স্টাডিহল আর হস্টেলের করিডোর আর জানলাগুলোয় কোনো স্যার এসে বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়াল কি না সেই দিকে নজর রাখতে রাখতে, – অতি সন্তর্পণে ওই চাঁদনি মাঠ পেরিয়ে যেতে হবে।

বাল্যাবধি বহুৎ ব্যাটম্যান বহুৎ দস্যু মোহন পেঁদিয়েছ। লাও এবার।

এখনো ভাবলে কী অদ্ভুত শিরশিরানি লাগে, – ঠিক চলে গেলাম আমরা একটুও ধরা না পড়ে, অবিকল রূট মাফিক, প্ল্যান মাফিক! ঠিক সময়ে ঝুঁকে ফ্রিজ করলাম, ঠিক সময়ে দ্রুত পেরিয়ে গেলাম বিবেকমন্দিরের জানলা দিয়ে আসা বেমক্কা একটুখানি আলো। কালো শাল মুড়ি দিয়ে, যেখানে সিঙ্গুরের খোঁড়াখুঁড়ি রাতেও চলছে আলো হেডলাইট জ্বেলে, সেখানকার নতুন হওয়া গার্ড কেবিনটার দিকে, ওখানেই হবে আমাদের বেস। অন্ধকারের মধ্যে অতদূর কেউ দেখতে পায় না, এই সময়টা ওখানে কেউ থাকেও না। ঘড়ি ধরে ঘন্টাখানেক থাকব, তারপর ধাম বা স্টাডিহল ফিরে যাব। কেউ জানবে না, স্যারকে বলেছি বিবেকমন্দিরে অসিতদার স্টাডি আছে, সেখানে হিস্ট্রি বুঝতে যাচ্ছি। … কে সন্দেহ করবে? সিনেমা নয়, সিগারেট নয়, বিদ্যাপীঠ বাউন্ডারীর বাইরে যাওয়া নয়, চারজন ছেলে স্টাডি পালিয়ে মাঠের ধারে গেছে চাঁদের আলো দেখতে!!

কেউ যেত না ওইসময় ওখানটায়। একবার সদন বা স্কুলবাড়ির নজরের রেঞ্জটা পেরিয়ে গেলে, আর লুকোনোর দরকার নেই। গাছের আড়াল আছে, আর তাছাড়া ওদিকের জমিটা অনেকটা নীচু। আমরা যা চেয়ে এসেছিলাম, সব এক্সপেকটেশন ছাপিয়ে গেল।

সারাদিন খোঁড়াখুঁড়ি চলেছে, ডোজাররা কাজ শেষ করে চলে গেছে। কেউ নেই, ডানদিকে ঝাউ আর ইউক্যালিপটাস বন, মাঝখানে একবুক পুরু সাদা ধুলো নিয়ে অদ্ভুত উপত্যকার মতো সিঙ্গুর পড়ে আছে। এদিকে ওদিকে বড় বড় শুকনো মাটির স্তূপ, ছাই ছাই রঙ, জোছনায় সব সাদাকালো প্যাটার্ন হয়ে গেছে, ছায়া না গর্ত বোঝা যায় না। ধুলোর ওপর চওড়া ডোজারের চাকার দাগ। আমাদের পা ফেলার সাথে সাথে ধুলোয় চটি ডুবে যাচ্ছে, চাকার দাগের ওপর বড় হয়ে পায়ের ছাপ পড়ে থাকছে। চারদিকে অগাধ জ্যোৎস্না।

মনে হল, পৃথিবীতে না, চাঁদের রাজ্যে এসে পড়েছি। চাঁদে টিনটিন!

ঝুঁকে পড়া ঝাউবনের নীচে সব লুকিয়ে কেমন অদ্ভুত ছায়া পড়েছে, সেই দিকে তাকিয়ে আমরা অবাক হয়ে রাতের প্রতিধ্বনি শুনছি।

আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম। কী যেন ছিল, সেই আকাশে। চারজন নিয়মভাঙা নেশাড়ুর সাথে প্রকৃতির সেই ব্লাইন্ড ডেট। আমাদের সাথে কার একটা যেন ক্যামেরা ছিল। ও তরফেও কেউ ছবি তুলে রেখেছিল কি?

ফিরে এসে সেদিন আর কারো পড়া হয়নি। তাই আবার হয়!

এক দিন এইভাবে স্টাডি নষ্ট। পরের দিন সন্ধেবেলা ভজন থেকে বেরিয়েছি, দেখি আকাশে আবার চাঁদ! আর, মাইরি, সাংঘাতিক দারুণ একটা জ্যোৎস্না! … মাইতি আর বেরাকে বললাম, ‘হেই, যাবি?’ …..দু’জনে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন গলায় চেন ঝোলা পাগল দেখছে, – তারপর হাল-ছাড়া মাতালের মত দাঁত বের করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল — ‘চল!!!!’

.
.
.
দু’বার না, তিনবার না চারবার গেছিলাম আমরা টেস্টের আগে এইভাবে স্টাডি পালিয়ে, চাঁদ দেখতে।

পরে আরেকটু বয়স বাড়ার পর জেনেছিলাম, লুনাটিক কথাটা আসলে কোথা থেকে এসেছে।

(…বাকি…)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *