নীল-কালো (৩)

তৃতীয় অংশ

“রেপ”

“Everything in the world is about sex except sex. Sex is about power.”

চুরির গল্পে একজন লিখেছে, এগুলোর সাথে আমাদের বৃহত্তর সমাজের খুব ভালো মিল আছে। – আসলে, আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমরা কেউ কেউ বিদ্যাপীঠে থাকতেই বলাবলি করতাম, বিদ্যাপীঠ আসলে পুরো সমাজের একটা সংক্ষিপ্ত, বনসাই ভার্সান। কলেজী ভাষায় একে বলে মাইক্রোকজম। বাইরের দুনিয়ায় যা বৃহৎ আকারে দেখা যায়, তারই ছোট্ট রূপ, ক্যাম্পাসের চার দেওয়ালের ভেতর। দুনিয়ায় যেমন রাজা উজির কোটাল সওদাগর রাজপুত্র রাজকন্যা চোর ডাকাত পুরোহিত বিদূষক সবরকম আছে, তেমন আমাদের ক্যাম্পাসের ভেতরকার ‘বিদ্যাপীঠ-পরিবার’-এও এই সবরকমই আছে।

Continue reading

নীল-কালো (২)

দ্বিতীয় অংশ

“চোর-পুলিশ”

“কে একজন বলিল – পাকা চোর –

টেঁপি বলিল – বাগানের আমগুলো তলায় পড়বার জো নেই কাকীমা –

শেষোক্ত কথাতেই বোধ হয় সেজ ঠাক্‌রুণের কোন ব্যথায় ঘা লাগিল। তিনি হঠাৎ বাজখাঁই রকমের আওয়াজ ছাড়িয়ে বলিয়া উঠিলেন – তবে রে পাজি, নচ্ছার চোরের ঝাড়, তুমি জিনিস দেবে না? দেখি তুমি দেও কি না দেও! কথা শেষ না করিয়াই তিনি দুর্গার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া তাহার মাথাটা লইয়া সজোরে দেওয়ালে ঠুকিতে লাগিলেন।”

ইস্কুলে চুরি, – পাশ-ফেল, র‍্যাগিং বা লাভলেটারের মতই প্যানডেমিক ঘটনা। চুরি অনেকরকম হত। ছেলেরা স্কুলের জিনিস চুরি করত, – যেমন গাছ থেকে আম বা পেয়ারা বা বাতাবিলেবু চুরি, এমনকী লিচু চুরি। পরে কলেজে থাকতে আমরা সফলভাবে একাধিকবার কাঁঠাল চুরি করেছি। এইসব চুরির গল্প এখানে করব না। এখানে অন্য চুরির গল্প হবে, যাকে রোমান্টিসাইজ করা একটু কঠিন।

Continue reading

নীল-কালো (১)

প্রথম অংশ

“মার”

“The rebel took the bank job because she sees her rebellion is fruitless. The player stays faithful to his wife because the consequence of infidelity is much greater now. But their instincts – their instincts never change.”

রাতে বেডে শুয়ে শুয়ে শুনছি, ভৈরব মহারাজের রুমের দিক থেকে প্রচণ্ড মার আর চীৎকারের আওয়াজ আসছে। শুধু আমরা না, আমাদের ধাম না, সারা সদন শুনছে। নিয়ম থার্ড বেলের পরে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া, কিন্তু সেদিন কেউই ঘুমোচ্ছিল না। ওই শব্দ শিবানন্দ সদনের এমাথা-ওমাথা শোনা যাওয়ার কথা। তাছাড়া ব্যাপারটা সবাই জানত।

Continue reading

নীল-কালো (০)

কৈফিয়ৎ

স্কুলবেলার গল্প প্রায়ই করে সবাই, আমিও করি। এবং সবাই বলে স্কুলের সময়টা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। কিন্তু স্কুলজীবন সুন্দর ছাড়াও আরেকটা জিনিস, সেটার কথা কেউ বলে না।

মানুষের স্কুললাইফে যত ভায়োলেন্স আর নিষ্ঠুরতার গল্প চাপা থাকে, স্মৃতিচারণের সময় আমরা সেগুলোকে খুব একটা ভেসে উঠতে দিই না। চেপে যাই, এবং চেপে রাখি।

Continue reading

ভয়ঙ্কর স্বপ্ন

কাল রাত্রে ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখিচি। দেখিচি বলে তো মনে নেই, কিন্তু স্বপ্ন দেখে যখনি ঘুম ভেঙে গেল, তখুনি হোয়াটস্যাপে যা দেখলুম তার কীওয়ার্ড টাইপ করে পাঠিয়ে রেখেচি, জানি সকালে মনে থাকবে না। দেখচি আমরা একজায়গায় গিয়েচি, যেন একটা ক্যাম্প মতন কিছু। আমাদের একটা বাড়িতে থাকতে দিয়েচে, ভেবে দেখচি খানিকটা যেন আমাদের ব্রহ্মানন্দ সদনের মতো ছিল। দোতলায় ঘর পেয়েচি, সেখানে রাত্তিরবেলা খাটে শুয়ে দরজা দিয়ে বাইরে দেখি পাহাড় দেখা যাচ্চে, আমরা যেখানে আচি সেখানটা পাহাড়েরই গায়ে, সামনেই ঢাল নেমে এসেচে। আর তারপর দেখি, হ্যারি পটারের মতো যেন কারা ঝাঁটায় চড়ে হুস হুস করে ওপর থেকে উড়ে এসে বেরিয়ে গেল। তারপরেই দেখি ডাক পড়েচে। তখন যেন একটু একটু বুঝচি, এ ক্যাম্প হ্যারি পটার অ্যাকটিভিটি করারই ক্যাম্প। রাতে এখানে বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে কীসব করানো হয়, কীভাবে হয় জানিনা। এক দঙ্গল ছেলেপিলের সঙ্গে আমিও বেরোলুম।

Continue reading

ইংরেজী/বাংলা (৪)

বাংলার ছাত্রছাত্রীদের আরেকটা বড় দুর্ভাগ্য আছে, সেটা হল – তারা জন্মেছে বাঙালীর ঘরে।

রবীন্দ্রনাথ এককথায় বলেছিলেন, “শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে / দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে। / সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, / রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।” – এই যে মানসিক শীর্ণতার অভিশাপ, এই অভিশাপের দাগ আজ পর্যন্ত বাঙালীর কপাল থেকে ঘোচেনি।

Continue reading

ইংরেজী/বাংলা (৩)

আমাদের দেশে ইংরেজী শেখানো হয় গ্রামার বই পড়িয়ে। যে ভাষা গ্রামার বই পড়িয়ে শেখানো হয়, মানুষ সেই ভাষায় কোনোদিন সাবলীল হতে পারে না।

একদিন একজন স্টাডিহলে হ্যারি পটার পড়ছিল, দেবাশিসদা ধরেছিলেন। ধরে যখন দেখেন যে ছেলে পড়ছে হ্যারি পটার, তখন হেবি খুশী হয়ে স্টাডিহলে প্রায় ঘোষণার সুরে বললেন, হ্যারি পটার? যাও পড়ো গিয়ে! অ্যায় শোনো, হ্যারি পটার খুব ভালো বই, সবাই পড়বে। পড়লে ভালো ইংরেজী শিখতে পারবে।

Continue reading

ইংরেজী/বাংলা (২)

বাংলা মিডিয়ামে শিফ্‌ট করার পরে একটা মজা হল, সেটা ঠিক প্রাসঙ্গিক না হলেও গল্প হিসেবে কৌতুককর। আমি নার্সারী থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে আসছি, হঠাৎ ক্লাস ফোরে বিদ্যাপীঠে ঢুকে বাংলা মিডিয়ামে এসে পড়েছিলাম। ফলে, গণ্ডগোল হত। আমি ফোরের ফাস্ট পিরিওডিক্যাল পরীক্ষায় অঙ্কে পঞ্চাশে পঞ্চাশ পাইনি একমাত্র একটা ভুলের জন্য — ইংরেজীর আট আর বাংলার চার গুলিয়ে ফেলেছিলাম। সেসব ট্র্যাজেডির কথা থাক। অন্য যে গোলমালটা হয়েছিল, আমি ডন বস্কো থেকে সদ্য আসার দরুণ ইংলিশে বাকি সেকশনমেটদের তুলনায় খানিকটা বেশী স্বচ্ছন্দ ছিলাম। বাকিরা সবাই তুখোড় তুখোড় ছাত্র, ভালো স্টুডেন্ট না হলে পুরুলিয়া বিদ্যাপীঠে ঢোকা যেত না (মানে, *হ্যাঁচ্চো* ডোনেশন ছাড়া *হ্যাঁচ্চো*) কিন্তু ইংরেজীর ব্যাপারে প্রায় সবাইই একটু নার্ভাস। আমি নই। ফলে পরীক্ষায় আমি হায়েস্ট পেলাম, আর রটে গেল যে আমি ইংরেজীতে হেবি ভালো।

Continue reading

ইংরেজী/বাংলা (১)

বাংলা মিডিয়াম আর ইংলিশ মিডিয়ামের দ্বন্দ্বটা পুরোনো। এই নাটক এখন চলছে, আমি যখন স্কুলে ছিলাম তখন চলত, আমার স্কুলে ঢোকার বহু আগেও নিশ্চয়ই চলেছিল, দাদারা চাইলে ঢের গল্প শোনাতে পারবেন।

দ্বন্দ্ব কথাটা ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম। স্কুলে বাংলা ক্লাসেই শেখা, দ্বন্দ্ব শব্দের মানে যেমন বিরোধ হয়, তেমন মিলমিশও হয়। সেই ঈশ্বরী পাটনির গল্পে লাইন ছিল, “কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।” – আমাদের দেশে বাংলা আর ইংরেজীর সম্পর্কটা দুই অর্থেই দ্বন্দ্বের।

Continue reading

ঘরের ভেতর একলা বসে
কতই কথা ভাবি,
পেরিয়ে আসা বিকেল বেলা,
অশথপাতায় রোদের খেলা,
ন্যাপথালিনের গন্ধ মাখা
পুরোনো পাঞ্জাবী।

ঘড়ির কাঁটা দুপুর গোনে,
একফালি রোদ ঘরের কোণে,
ক্যালেন্ডারের গা ঘেঁষে ওই মরচে-ধরা চাবি।
ঘরের ভেতর এমনি বসে
নানান কথা ভাবি।

জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে
হলুদ নিমের পাতা,
আলমারীতে চুপটি করে
বইরা ঘুমায় সারে সারে
কাগজমোড়া বাক্সে রাখা
স্কুলবেলাকার খাতা।

শান্ত গিটার চুপ করে রয়
ছায়ার মত দীর্ঘ সময়
পুরুলিয়ার ট্রাঙ্কে জমা দু’মুঠো কলকাতা।
কে জানে কার জন্যে রাখা
স্কুলবেলাকার খাতা।