বাগান

ধরা যাক একটা বাগান। বাগানে সারি সারি চারাগাছ, তাতে একজন লোক তিনবেলা জল দেয়, সময়মতো ওষুধ দেয় সার দেয়। লোকটা একজন মালী।

এবার, একধরনের জিনিস হয় যার নাম কেমিক্যাল ওয়াই। চারাগাছের গোড়ায় যদি নিয়মিত কেমিক্যাল ওয়াই দেওয়া হয়, তাহলে সেই চারাগাছ বড় হয়ে আপেলগাছ হয়। আর আরেকরকম জিনিস আছে যার নাম কেমিক্যাল জেড, চারাগাছের গোড়ায় নিয়মিত দিলে সেই গাছ বড় হয়ে লেবুগাছ হয়।

আমাদের মালী আপেলবাগান করতে চায়। তাই সে যখনই সুযোগ পায়, চারাগুলোর গোড়ায় খানিকটা করে কেমিক্যাল ওয়াই দিয়ে যায়। ভালো ভালো আপেলগাছ হবে, ঠিকমতো ওষুধ পড়লে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।

এই বাগানে একমাত্র সে-ই যে মালীর কাজ করে, তা নয়। অন্য মালীরাও আছে। তারাও গাছ করে। এবং তাদের বেশীরভাগই চায়, লেবুগাছ হোক, আপেলগাছ নয়। তাই তারা যখনই পারে, চারার গোড়ায় কেমিক্যাল জেড ঢালে।

কোন চারা বড় হয়ে কী হবে, তা নির্ভর করছে কোন ওষুধ বেশী পড়েছে তার ওপর। কোনো মালী তো আর সারাদিন বাগানে থাকে না, তাই কেউ জানে না কোন গাছে কে কীরকম ওষুধ দেয়। তারা যে গাছগুলোর পরিচর্যা করে, তা করে কী গাছ করছে সেসব কিছু না জেনেই। কিন্তু লেবুগাছের পাল্লা ভারী, কারণ বেশীরভাগ মালীই তা-ই চায়। আমাদের মালীও নিজের মতো কাজ করে যায় এবং সময়মতো কেমিক্যাল ওয়াই দিয়ে যায়, কারণ হাজার হোক – বলা তো যায় না?

আপনি এবার ভাবুন যে এই মালীর চাকরিটা আপনি করতে রাজী হবেন কি না। কীসে জল দিচ্ছেন জানতে পারবেন না, হয়তো যে গাছের গোড়া যত্ন করছেন সেই গাছ হয়ে দাঁড়াবে আপনার দু’চক্ষের বিষ যা, তাই। আপেলবাগানের স্বপ্ন দেখে কাজ করবেন, শেষে দেখবেন লেবুতলায় দাঁড়িয়ে আছেন। খুব র‍্যানডম না? একেবারে বাড়া ভাতে ছাই না হলেও, নিজে ডিমে তা দিয়ে পরের ছানা ফুটে বেরোতে দেখার মতোই তো?

এইজন্যেই, ভিশনারি মানুষজন যারা আছেন, স্কুলমাস্টারী করবেন না। করতে এলে বুঝেশুনে আসবেন। কারণ শিক্ষকতা জিনিসটাকে চলতি কথায় যা বলে দেখানো হয়, শোনানো হয় এবং ওড়ানো হয়, – শিক্ষকতা জিনিসটা আদতে ততটা সরল এবং একমাত্রিক নয়।

মনে রাখা ভালো যে পৃথিবী অনেক। সেই অনেকগুলো আলাদা আলাদা পৃথিবীর বাসিন্দারাও বহুবর্ণ। আর তারা এবং তাদের পৃথিবীরা – সবটাই, সবগুলোই ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়।

আপনি যে আদর্শ মনে নিয়ে ‘ভবিষ্যৎ গড়া’-র জন্য কোমর বেঁধে নামতে যাচ্ছেন, সেই আদর্শ তো আপনার নিজের। বাকিদের তো তাদের নিজেদের মতো আলাদা আলাদা আদর্শ আছে। বাগানে শুধু আপেল আর লেবু নয়, আরো পাঁচশোরকম ফল আর সেই ফল করার কেমিক্যাল আছে। সব মিলে কী দাঁড়াবে? কেউ জানে? কেউ জানে না।

আপনি যাদের নিয়ে কাজ করতে চাইছেন, তারা কিন্তু আপনার হাতের মানুষপুতুল নয়। আপনিও কোনোমতেই তাদের ভবিষ্যৎবিধাতা নন। আপনি একটি অতি র‍্যান্ডম ভেক্টর। ছুঁড়ে দিচ্ছেন নিজেকে। নিজের সমস্ত এলোমেলো আলুথালু সমেত। লুক বিফোর ইউ লীপ।

…….

কাহলিল গিব্রান লিখে গেছেন, আপনার সন্তান আপনার সন্তান নয়, সে জীবনধারার পরবর্তী উন্মোচন। সে তীরের মতো আপনার কাছ থেকে উড়ে চলে যাবে। আপনি রয়ে যাবেন নিজের মতো, যেমন ধনুক থেকে যায়।

এই যে পাগলের হাতে পেন্সিল তুলে দেবার মতো নিজের স্বপ্নকে ভবিষ্যতের কাছে সঁপে দেওয়া, কী হবে কিছুই না জেনে, এটা করা সবার কাজ নয়। শিক্ষকতা বলতে যে মহান, আদর্শবাদী চিন্তাটা মানুষের মনে ভেসে ওঠে, সেটা আসলে স্রেফ এই গ্যাম্বলটা ছাড়া কিচ্ছু না। লিখতে লিখতে এক বন্ধু বলল জিনিসটা একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো কিনা। একরকম বলাই যায়, কিন্তু এর স্টেকস অনেক বেশী হাই। কারণ এমনি অ্যাডভেঞ্চারে রিস্ক একা আপনার, আর এতে…

ভিয়েনার অ্যাকাডেমী অফ ফাইন আর্টসে ভর্তি হতে চেয়ে অ্যাপ্লাই করেছে একজন ছাত্র। ছবি আঁকা ছাড়া জীবনে অন্য উদ্দেশ্য নেই। রাজনীতি-ফাজনীতি বোঝে না, বুঝতেও চায় না। শিল্পী বলেই পরিচয় দিতে পছন্দ করে। কিন্তু না, ভর্তি নিল না। অধ্যাপকেরা খারিজ করে দিলেন আবেদন। তোমার দ্বারা আর্ট হবে না, আর্কিটেকচার চেষ্টা করে দ্যাখো গে।

ছবিছাবা এঁকে কিছুদিন চালানো যায়, কিন্তু কোনো তকমা ছাড়া, পরিচিতি ছাড়া, শুধু ওই করে জীবনধারণ করা যায় না। সুতরাং একদিন আর্মিতে নাম লেখাতে হল।

অধ্যাপকরা যদি অ্যাডভেঞ্চারটা ঠিক ওইরকম না করে একটু অন্যরকম মতো করতেন, তাহলেই হয়তো ছেলেটা কিছুটা ভালোবাসা, কিছুটা খ্যাতি, কিছুটা অর্থ উপায় করে নিতে পারত, নিজের মতো একটা কোণ খুঁজে নিতে পারত পৃথিবীর এক ধারে। অল্পেই সুন্দর হতে পারত তার জীবন, এত পথ পেরিয়ে অ্যাডলফ হিটলারকে আর ইতিহাসবিখ্যাত হতে হত না। তাই না?

সবটাই কি আর ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প। টম রিডলকে তো প্রোফেসর স্লাগহর্ন ফিরিয়ে দেননি। স্বপ্ন হাতবদল হয়ে গিয়েছিল শুধু।

সেদিন উদয়নকে বলছিলাম স্বপনদার কথা। স্বপনদার একটা অদ্ভুত জিনিস ছিল, যেটা জীবনে খুব বেশী দেখিনি। সেটা হল ছেলেদের ওপরে একটা অদ্ভুত জোরালো বিশ্বাস। একটা নাছোড়বান্দা, অনড় প্রত্যয় ছিল যে এই এরাই হল সলিউশন। এরাই পারবে। যা যা দরকার যা কিছু করা বাকি, সব এই এরাই করবে, এবং করবেই। – সমস্ত যুক্তি এবং সন্দেহকে কাটিয়ে যেত এই স্বপনদার এই ভয়ানক জেদ। প্রতি পলে বিশ্বাস করতেন, আমরাই প্যানাসিয়া, এবং সেইমতো আমাদের সাথে ব্যবহার করতেন। স্বপনদার মার বিদ্যাপীঠের গল্পে বিখ্যাত, কিন্তু আরও কিংবদন্তী হল ছেলেদের ওপর স্বপনদার নির্ভরতা।

আমিও আজকাল ছাত্রছাত্রীদের পড়াই। কিন্তু ওইরকম নির্ভরতা, ওই অগাধ এবং অসীম বিশ্বাস – আমি নিজে দেখেছি, আমার মধ্যে কিন্তু নেই। এখনো অবধি নেই।

সব যুগে সব দেশে ৯৯.৯৯% মানুষ সবসময় ভেবে এসেছে যে উঠতি প্রজন্ম ভেসে যাবে। এক পোড়া সময় এসেছে, সবকিছু ভাঙছে, এবং যে দুঃসময় আসছে তা এই আগামী ছেলেমেয়েরা কিছুতেই সামলাতে পারবে না। এরা যে ঠিকঠাক নয়। কী হবে!

স্বপনদা যেমন কোনো অবস্থাতেই ভাবেননি। অমানুষিক আশা এবং ভরসা নিয়ে আমাদের সাথে থেকে গেছেন সবসময়। যে যে স্বপ্ন দেখে আমাদের সাথে কথা বলতেন, তার কতটুকু সত্যি হয়েছে? – যশের সাথে কথা হয়েছিল: কত ব্যাচ বেরিয়েছে এইধরনের লোকগুলোর হাত দিয়ে? আর তার মধ্যে কতজন ছেলে আমরা শক্তিদা-স্বপনদার কাছ থেকে বেরিয়ে শক্তিদা বা স্বপনদার মতো কিছু একটা হয়েছি? প্রায় কেউই না। – তার মানে কি এসব জীবন আসলে নিরানব্বই ভাগ বিফল?

আমার এক প্রফেসর ছিলেন। কাল খবর পেলাম তিনি মারা গেছেন। তাঁর শিক্ষক-জীবন অবশেষে ফুরিয়েছে । আমি ভাবছিলাম, – চলে যে গেলেন, কী করে গেলেন? আমিও তো একদিন যাব। কী করে যাব? শিক্ষকতা নিয়ে মানুষ মিথ কম বানায় না। কিন্তু আসলে কি কিছু থাকে?

ভেবে দেখলাম, মানুষ কীভাবে কোথা দিয়ে বেঁচে থাকে তা সত্যি অদ্ভুত। আমি যে লাইন প্রথম ডিএসসির ক্লাস করতে গিয়ে শুনেছিলাম, সেই লাইন আমার কিছু ছাত্র এখন আমার কাছে শুনেছে। আমি যে লেখকের নাম ডিএসসির ব্ল্যাকবোর্ড থেকে খাতায় টুকে নিয়েছিলাম, সেই লেখকের বই আমার রেকমেন্ডেশনে এখন আমার স্কুলের লাইব্রেরীতে কেনা হয়েছে, তা ছাত্ররা হাতে নিয়ে পড়ছে। যে টুকরোটাকরা কথা ক্লাসরুমের আওতায় ঠিক আসে না, সেই সব এলোমেলো স্মৃতিরা এখনো মাঝেমাঝে মনে পড়ে গিয়ে আমাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।

বিফল বলা যায় কি? হতেই পারে আমরা যেখানে যা হওয়াতে চাই, সেখানে তা হয় না। কিন্তু কোন বীজ কোথায় মাটি পেয়ে যায়, একদিন হঠাৎ গাছ হয়ে মাথা তোলে, কেউ তা দেখতে পায় কি?

র‍্যানডম তো সবটাই। কেউই জানে না যে কী হবে। কিন্তু মনে রাখা ভালো যে এই বর্তমানের ময়দানে কিন্তু আপনিও একটা র‍্যানডম ভেক্টর। যত কমই হোক, আপনারও কিন্তু একটা চান্স আছে। কোথা দিয়ে কী হয়ে যায়, বলা তো যায় না?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s