পুরানো সেই দিনের কথা (২) – “বর্ষামঙ্গল”

……
………………..
……………………………………………..
…………………………………..
……………………..
……………………………………………………………………………………
.
.
.
 
 
এইমাত্র বলছিলাম, নানাভাবে পশুপাখিরা নিজেদেরকে নানারকম গরম-ঠাণ্ডার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপার আমরা খেয়াল করিনি। একটা বিরাট কথা আমাদের নজর এড়িয়ে এতক্ষণ আমাদের ফাঁকি দিয়ে এসেছে। বিপাক বা মেটাবলিজম – এ তো প্রাণের শর্ত। প্রাণের অধিকারী কি এই পৃথিবীতে কেবল আমরাই, পশুপাখিরাই? 

 
 আমরা যতক্ষণ ডাইনোসরের সূত্র ধরে পাখির বংশপরিচয় খুঁজতে ব্যস্ত থেকেছি, বিশালদেহী ব্র্যাকিওসরের খাওয়ার মাপ আর টী-রেক্স বা কেরানিপাখির শিকার ধরা নিয়ে ছেলেমানুষী করেছি, – আমাদের চারপাশে অফুরান অথচ নীরব উপস্থিতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেরা ততক্ষণ আমাদের অলক্ষ্যেই মুচকি মুচকি হেসেছে। প্রাণের দরবারে পশুপাখিদের পাশাপাশি গাছের গৌরব সমান, হয়তো গাছ মহত্তর। আমরা ‘কত বড়’-তে সহজেই চমকিত হই। একাল-সেকাল মিলিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পশু যে, তার দৈর্ঘ্য তিরিশ মিটার, ওজন একশো আশি টন। আর আমেরিকার রেডউড গাছ লম্বায় হয় পঁচাশি মিটারের ওপর, ওজনের কথা আর নাই বা ভাবলাম। বাঁচে দু’হাজার বছরের কাছাকাছি। 
 
তাহলে গাছেরা খুব বেশী গরম বা খুব বেশী ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচায় কী করে? ওদের শরীরে রক্ত বলে কিছু নেই, কাজেই গরম-রক্ত ঠাণ্ডা-রক্তের হিসাব এখানে খাটবে না। গাছের দেহে প্রাণরস বলতে মূলতঃ দুটো – এক হল জল, আর এক হল খাদ্যরস। ওদের খেয়াল রাখতে হয় যাতে শরীর শুকিয়ে না যায় বা জমে না যায়। বেশী গরমে শরীরের কিছু কিছু উপাদানও নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কোষের সরস অংশের কোনো কোনো ধর্ম নষ্ট হতে পারে। কাজেই উষ্ণতাকে সামলে রাখা খুবই প্রয়োজন।
 
উষ্ণতা কাকে বলে? কতটা তাপ জমে আছে, তার মাপই হল উষ্ণতা, সরলতর ভাষায় – তাপমাত্রা। তাহলে উষ্ণতা কমাতে হলে এই তাপ খরচ করার রাস্তা দেখতে হয়। গাছের হাতে এর একটা খুব সহজ উপায় আছে, – জল। গাছের সারা শরীর জুড়েই কিছু নির্দিষ্ট অংশে জল ধরা থাকে, সেই জলকে যদি বাষ্প হতে দেওয়া যায়, তাহলেই গাছের গরম জুড়ায়। ঠিক যে কারণে আমাদের ঘাম হয়। আমরা যদি না ঘামতাম, তাহলে আমাদের বাঁচা কঠিন হত। জল থেকে ভাপ হয়ে উবে যেতে যে তাপ দরকার, সেটা ঘাম নেয় আমাদের শরীর থেকেই; ফলে খানিকটা heat খরচ হয়, আমাদের গা ঠাণ্ডা হয়। গাছও অনেকটা একই কাজ করে, শরীরের খুব সূক্ষ্ম একধরনের ছিদ্র দিয়ে বিন্দু বিন্দু জল বাতাসে বাষ্প করে ছেড়ে দেয়, একে বলে transpiration। এতে জল খানিকটা খরচ হয় ঠিকই, কিন্তু সেটা তেমন সমস্যা হয় না, বেশিরভাগ গাছের কাছে জল জোগাড় করা কঠিন নয়। কিন্তু যেসব গাছ জল থেকে দূরে মরুভূমিতে জন্মায়, তাদের ঠাণ্ডা থাকার জন্য অন্য পথ নিতে হয়।
 
 
মরুভূমির গাছেরা সহজে জল পায় না। তাই ট্রান্সপিরেশনের রাস্তা তাদের কাছে বন্ধ, জল খরচ করে ফেললে শুকিয়ে মরতে হবে। এরা অত্যধিক তাপ থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের শারীরিক গঠন বদলে নেয়। মাটির সাথে সংস্পর্শ যথাসম্ভব কমিয়ে আনে – যাতে তেতে ওঠা মাটির ছোঁয়ায় গরম না লাগে, হাওয়ায় হাওয়ায় শরীর ঠাণ্ডা থাকে। শরীরের যে অংশ মাটির ওপরে, তার গড়ন এমন হয় যাতে সূর্যের রোদ সরাসরি গায়ে না পড়ে। ফণিমনসার চেহারা মনে করলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়। চ্যাপ্টা সবুজ চাকতির মতো কাণ্ডের অংশগুলো খাড়াভাবে রয়েছে, মাটির সমান্তরালভাবে নেই। সমান্তরাল থাকলেই রোদটা সরাসরি গায়ে পড়ত, – যেমন আম-জাম-কাঁঠালের পাতায় পড়ে। কিন্তু ফণিমনসার চ্যাপ্টা চাকতি যেহেতু খাড়াভাবে সাজানো, তার ওপর রোদের প্রকোপ হয় অনেক কম। 
 
মরুভূমির মধ্যে অবশ্য মেরু অঞ্চলও পড়ে, – সেগুলো ঠাণ্ডা মরুভূমি। জলের অভাব সেখানেও সমান। বরফ প্রচুর, কিন্তু nor any drop to drink। শরীরের মধ্যেকার জল সেই ঠাণ্ডায় জমে যেতে চায়। যদি জমে যায়, তাহলে গাছের মরণ নিশ্চিত। কাজেই এদের প্রথম কাজ হয় শরীরকে ঠাণ্ডা না হতে দেওয়া, যতটা পারা যায় গরম রাখা। বরফ দেশের এই গাছেরা তাই ফণিমনসার উল্টো পথ নেয়। ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে তারা শরীরকে মাটির ওপর ছড়িয়ে দেয় – শীতের ঠাণ্ডা শুকনো বাতাস থেকে বাঁচার জন্য। মাটিতে বিছিয়ে যাওয়ায় রোদ পেতে‌ও সুবিধা হয়, সূর্যের তেজে পুরোমাত্রায় তারা গা সেঁকে নিতে পারে। কোনো কোনো গাছ সূর্যমুখীর মতো সারাদিন সূর্যের গতি অনুসরণ করে, ফুল-ধরা অংশে যতটা পারে রোদ নেয়। কারো কারো শরীরে এমন ব্যবস্থা থাকে যা গা-ঘেঁষে যাওয়া বায়ুপ্রবাহের গতি কমিয়ে দেয়, ঠাণ্ডা হওয়া কমায়। শুধু বাইরে নয়, ভিতরেও প্রস্তুতি থাকে। 
 
 
যেসব দেশে খুব বরফ পড়ে, সেখানে প্রায়ই রাস্তার বরফ গলিয়ে পরিষ্কার করার জন্য তার ওপর নুন ছড়ানো হয়। সাধারণ জল যত সহজে জমে বরফ হয়, নোনা জল তত সহজে জমে না। শূন্য ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের চেয়েও আরও কিছুটা তাপমান কমলে তবে নোনা জল জমাট বাঁধে। তাই রাস্তায় জমা বরফে – যার তাপমান 0 °C – তাতে নুন ছড়ালে সেই বরফ গলে তরল হয়ে আসে, নোনা জলকে কঠিন রাখার জন্যে 0 °C যথেষ্ট নয় বলে। অতিরিক্ত শীত সহ্য করতে হয় যেসব গাছকে, তারা কোষের মধ্যে উপযুক্ত কিছু রাসায়নিক উপাদান জড়ো করে সেখানকার হিমাঙ্ক কমিয়ে আনে, যাতে জমে যাওয়ার মতো ঠাণ্ডা পড়লেও গাছের ভিতরকার জল না জমে।  
 
 
গাছেদের অভিযোজনের ধরন আমাদের থেকে অনেকটা আলাদা। মূল নিয়মগুলো একই, কিন্তু বিবর্তনের যাত্রায় প্রাণী আর উদ্ভিদ এগিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পথে। লাইনটা লিখতে গিয়ে কলমে একটা হোঁচট খেলাম। একটা পুরোনো অমত আছে আমার, ওই ‘প্রাণী’ শব্দটা নিয়ে। প্রাণ যারই আছে, তারই তো ওই নামে সূচিত হবার অধিকার থাকা উচিত। তাহলে কেন ভাগ করা হয়েছে – ‘প্রাণী’ আর ‘উদ্ভিদ’? বিকল্প নাম কি নেই Kingdom Animalia-র জন্য? – না থাকলে আপাতত বাংলায় ‘অ্যানিম্যাল’-ই বলতে পারি। উপযুক্ত পরিভাষার অপেক্ষায় রইলাম, না পেলেও ক্ষতি নেই। প্রাণের মতো ভাষাও চির-বিবর্তনশীল, – যদি তাকে বেঁচে থাকতে হয়।
 
 
ডাইনোসর বলতে যাদের বুঝি, তাদের প্রথম দেখা গিয়েছিল আজ থেকে আন্দাজ ২৩৫ মিলিয়ন বছর আগে। পৃথিবীর ইতিহাসের ভাষায় সেই পর্যায়ের নাম Triassic period। ট্রায়াসিকের পরে এসেছিল Jurassic –  আমাদের সর্বাধিক পরিচিত নাম; আর তার পরে Cretaceous। তিন পর্যায় একসাথে মিলে হয় Mesozoic era। 
 
ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আমাদের দিন-হপ্তা-মাস-বছরের হিসেব পৃথিবীর বয়স নিয়ে কথা বলতে গেলে কার্যকরী হয় না। এত দীর্ঘ বিস্তার এই প্রাক-ইতিহাসের, যে শতাব্দ-সহস্রাব্দের মাপও কম পড়ে। তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর রূপবদলের গতি সবসময় সমান ছিল না। এসবের সাথে সঙ্গতি রেখে বিজ্ঞানীরা তাই একটা সময়ের মাপ ঠিক করেছেন, যাতে পৃথিবীর জীবনের প্রতিটা অধ্যায় নির্দিষ্ট ভাবে ছকে রাখা যাবে। এই টাইম স্কেলের নাম Biogeological Time Scale। প্রাণের বিকাশের বিভিন্ন ধাপকে এখানে চিহ্নিত করা আছে, তাই ‘বায়ো-‘, আর পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক বিকাশের ইতিহাসও চিহ্নিত করা আছে বলে ‘জিও-‘। হাত ধরাধরি করে এই গ্রহ, আর এই গ্রহে জন্ম নেওয়া প্রাণ, – দুইই বড় হয়ে উঠেছে। 
ChronostratChart2015-01 - Copy
 
এই স্কেলে সবচেয়ে বড় যে সময়ের মাপ, তার নাম eon। ইয়নের ভাগ করলে তাদের বলা হয় era, এরা ভাগ করলে হয় period, পিরিয়ড ভাগ করলে হয় epoch, আর ইপককে ভাঙলে পাওয়া যায় এক একটা age। ডাইনোসরদের উত্থান যে সময়ে হয়, তা হল Phanerozoic eon-এর Mesozoic era-র Triassic period। এই eon, era, period, epoch, age – এদের বাংলা কোনো পারিভাষিক প্রতিশব্দ আছে কি না আমি জানিনা। আমি ভেবেছি – কাল, পর্ব, পর্যায়, অধ্যায়, যুগ, – ইন অর্ডার। পাখিরা জুরাসিকের শেষ দিকেই রূপ পেতে শুরু করেছিল, ক্রীটাশিয়াস পর্যায়ে এসে মোটামুটি আমাদের পরিচিত চেহারা নিতে আরম্ভ করে। এই ক্রীটাশিয়াসেই ডাইনোসরদের অবলুপ্তি। 
 
‌আজ থেকে সাড়ে তেইশ কোটি বছর আগেকার যে পৃথিবীতে ডাইনোসররা জন্ম নিয়েছিল, তার বনভূমির চেহারা কেমন ছিল? আজকের মতো অবশ্যই নয়। প্রাগৈতিহাসিক অরণ্যের অবশেষ আমাদের সময়ে থেকে গেছে – আমরা জানি তার নাম কয়লা। কয়লার জন্ম যে বনের থেকে, তার বয়স ডাইনোসরদের থেকেও অনেক বেশী। সেটা Carboniferous period, ট্রায়াসিক পর্যায়েরও পাঁচ কোটি বছর আগেকার কথা। গাছেরা তখন ডাঙার অবিসংবাদিত রাজা, বড় বড় জীবজন্তুরা সবাই সেসময় ভবিষ্যতের গর্ভে সুপ্ত। দৈত্যাকার ফার্ন আর শ্যাওলা গাছেরা দলে দলে পৃথিবী ভরিয়ে ফেলেছে। – ‘শ্যাওলা গাছ’ কথাটা শুনতে বেমানান – আধুনিক মানুষের কানে সেরকম ঠেকাই স্বাভাবিক। আমাদের পরিচিত শ্যাওলারা নিতান্ত ছোটো, কয়েক মিলিমিটার, বড়জোর সেন্টিমিটার দিয়ে তাদের মাপ হয়। কিন্তু কার্বনিফেরাস পর্যায়ে আজকের বড় গাছেদের জন্মই হয়নি। তিরিশ মিটার উঁচু বিশালদেহী শ্যাওলাদের সে আমলে দেখা যেত। আর ছিল ফার্ন, সাইকাড, হর্সটেইল গাছেরা। এদের কারও ফল ছিল না, ফুল ছিল না, বীজ ছিল না। জীববিজ্ঞানে যেসব অংশকে পাতা বা কাণ্ড বলা হয় – তাও এদের হত না। শুধু সবুজ শরীর নিয়ে কিশোর পৃথিবীর বুকে তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। আর তা সম্ভব হয়েছিল এক বিশেষ অভিযোজনের ফলে।
 
 
জলের গাছেরা যখন প্রথম ধীরে ধীরে ডাঙায় উঠে আসে, তখন তাদের শরীর ছিল একেবারেই সাদামাটা ধরনের। সালোকসংশ্লেষের জন্য সবুজ ক্লোরোফিল-ওয়ালা শরীর, আর জমি কামড়ে থাকার জন্য শিকড়ের মতো একধরনের জিনিস – নাম rhizoid। চেহারাও বিশেষ বড় হত না। জলের আশেপাশে, ভেজা-ভেজা জায়গায় তারা জন্মাত, কারণ জল ছাড়া জীবন অচল। পুষ্টি, প্রজনন – কোনোকিছুই জল ছাড়া চলবে না। এই গাছেরা ডাঙার পরিবেশে এতটাই নতুন যে আলাদা করে ‘জলপান’ করার কোনো বন্দোবস্ত তারা করে উঠতে পারেনি, সেযাবৎ জলের মধ্যেই তাদের জীবন কেটেছে যে! কিন্তু ডাঙার উঠে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেল, নতুন আগন্তুকরা জলা জায়গার ধারে ধারেই বাসা বাঁধল। কিন্তু তাই করে তো বেশীদিন চলে না। ‘জল পান’ করার উপায় বের না করলে ভালোভাবে ডাঙায় ছড়িয়ে পড়া যায় না, স্থলভাগের পুরোটাই প্রায় অধরা থেকে যায়। মাইল মাইল খালি জমি ফাঁকা পড়ে, – কেবল শিকড় বাড়ানোর অপেক্ষা। 
 
এক কথা থেকে আরেক কথা উঠে আসে। তখনকার স্থলভাগের প্রকৃতিও ভীষণ, ভীষণ আলাদা ছিল। স্থল তো চিরকাল ছিল না। গরম আধা-তরল পৃথিবীর ওপরভাগ আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত ডাঙা তৈরী হয়েছিল, যেমন করে দুধে সর জমে। ভেতরটা যদিও প্রায় একইরকম গরম থেকে গেল। এই সবে-হওয়া ডাঙা ছিল আগাগোড়া পাথুরে, রুক্ষ, চঞ্চল রাসায়নিক পদার্থে ভরা। অবিরাম অগ্নুৎপাত, গ্যাসোদগার, তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে, নতুন নতুন যৌগ তৈরী হচ্ছে – জ্যান্ত গ্রহ গড়ার কাঁচামাল। পৃথিবীর সেই শৈশবে বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য, এককোষী প্রাণের সৃষ্টি হয়ে গেছে, তখনও বাতাসে সেভাবে অক্সিজেন জমে ওঠেনি। যেটুকু অক্সিজেন তৈরী হয় সেটুকু সালফার আর লোহার সাথে বিক্রিয়ায় শুষে যায়। মোটামুটি আড়াইশো কোটি বছর আগে ধীরে ধীরে বাতাসে অক্সিজেন জমতে আরম্ভ করে। কিন্তু ডাঙা তখনো পাথুরে, বহু কোটি বছর পাথুরেই থাকবে।
 
জল থেকে উঠে আসা গাছদের সামনে যে স্থলভাগ খোলা পড়ে ছিল, তা এই পাথুরে ডাঙা।
 
অভিযোজনের পালা এল শিগগিরই। শুকিয়ে যাওয়া আটকাতে গেলে, কর্তব্য দুটো। এক, – যাতে জল শরীরে আসে, সেই ব্যবস্থা করা; দুই, – যাতে জল শরীর ছেড়ে না যায়, তার ব্যবস্থা করা। পরের ব্যাপারটা জরুরী, কেননা ডাঙা মানেই খোলা হাওয়া, আর খোলা হাওয়া মানে বাষ্পীভবন। ভেজা যেকোনো জিনিস খোলা ফেলে রাখলে ধীরে ধীরে তা শুকিয়ে যেতে বাধ্য। ডাঙার গাছদের গায়ে তাই দেখা দিল পাতলা মোমের স্তরের মতো cuticle। কিউটিকল একধরনের মোমের আস্তরণ, জলনিরোধক। গায়ে এর প্রলেপ পড়ার ফলে গাছের শরীর থেকে জল বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যাবার ভয় থাকল না। একটা অন্য সমস্যা হল বটে, কিন্তু তারও সমাধান মিলে গেল। গাছেরা শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজ চালায় সারা শরীর দিয়ে। জল উবে যাওয়া আটকানোর জন্য যখন কিউটিকল তৈরী হল, তখন এই গ্যাস আদানপ্রদানের পথও বন্ধ হয়ে গেল। তখন উদ্ভিদদেহে তৈরী হল stomata, – শ্বাসরন্ধ্র। গাছ ইচ্ছেমতো স্টোমাটা খোলা-বন্ধ করতে পারে, কাজেই বেহিসেবী জল নষ্ট আর গ্যাসের সহজে যাওয়া-আসা – দুইয়েরই সমস্যা মিটল। এ হল জল ধরে রাখার জোগাড়। এর পাশাপাশি, গাছের শরীরে দেখা গেল প্রথম vascular tissue। ভ্যাসকুলার টিস্যু আর কিছুই না – গাছের জল খাবার ‘স্ট্র’। সরু নলের মতো চেহারার টিস্যু সিস্টেম গড়ে উঠতে লাগল গাছের দেহের গভীরে, তাই দিয়ে নীচ থেকে জল শুষে নেওয়া চলে। অর্থাৎ, জলে শিকড় ডুবিয়ে রাখা নিয়ে কথা – সেটুকু যদি থাকে, বাকি শরীরটা অনায়াসে জল থেকে দূরে ছড়িয়ে উঠতে পারে, – আর্দ্রতার জোগান অব্যাহত থাকবে। এই হল গাছের ‘গাছ’ হয়ে ওঠার গোড়ার কথা। এই অভিযোজনের পর থেকে বিবর্তিত যত গাছ, মানে যাদের দেহে নলতন্ত্র আছে তারা সবাই – তাদেরকে একসাথে বলা হয় tracheophyte, অর্থাৎ ‘নলওয়ালা গাছ’ । নল তৈরী করার দুটো প্রভাব এবার গাছের জীবনে বড়ো হয়ে উঠল – তার জলের সমস্যা ঘুচল, আর সে আকারেও বড় হতে শুরু করল।
 
আধুনিক গাছের গঠনও যদি দেখি, দেখব তার structural দিকটা মূলতঃ দাঁড়িয়ে আছে তার ভ্যাসকুলার সিস্টেমের ওপর। এই নলের গোছা কীভাবে বাড়ছে, তার ওপরেই নির্ভর করে গাছটা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কেমন দাঁড়াল। গাছের জন্যে এটা অস্থিতন্ত্র আর সংবহনতন্ত্র – দুইই। প্রথম ভ্যাসকুলার গাছেরা যে আকৃতিতে পূর্বপুরুষদের অনেকগুণ ছাপিয়ে গেল, তার কারণ এটাই। জলের নল বড় হতে হতে গাছের শরীরটাও বাড়তে লাগল। এক পায়ে দাঁড়িয়ে সে উঁকি মারল আকাশে। শুধু ওপরে নয়, পাইপলাইন বাড়ল নীচের দিকেও। জলের খোঁজে শিকড় ছড়ালো কাছ থেকে দূরে, ডাঙার খাঁজ বেয়ে, পাথর ফাটিয়ে। 
 
আর এর থেকেই এলো এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। 
 
রুক্ষ ডাঙার পাথর ভেঙে গাছ তার শিকড় ছড়িয়ে দিতে লাগল, আর সেই ভাঙনের থেকে জন্ম নিল মাটি। পাথর থেকে নুড়ি, নুড়ি থেকে ধুলোবালি, – তার সাথে মিশল গাছের শরীরের পরিত্যক্ত অবশেষ। লাভা থেকে ঠাণ্ডা হয়ে অবধি এতদিন পৃথিবী কঠোর কঠিন হয়ে পড়ে ছিল, মাটির সৃষ্টিতে যেন তার শরীরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল। এ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন,  a one-time event। এমনটা ইতিহাসে একবারই ঘটেছিল, আর কোনোদিন এর পুনরাবৃত্তি হবে না, হতে পারে না। প্রাণের সৃষ্টি যেমন one-time event, একবার প্রাণ বিকশিত হয়ে যাবার পরে আর তার পুনরাবৃত্তির সুযোগ থাকেনি, – এও তেমন, একক। ডাঙায় উঠে আসা প্রথম গাছেরা এইভাবে মাটির জন্ম দিল। ইতিহাস সাক্ষী, – আজ অবধি মাটি সেই মাতৃঋণ শোধ করে আসছে। মাটিতে জন্ম নেওয়া কনিষ্ঠতম উত্তরপুরুষ হিসেবে আমরাও।
 
 
অলক্ষ্যে লেখা হয়ে চলে অনাগত জন্ম-ইতিহাস। এখনকার ক্যানভাসে যাদের বিচিত্র ছবি আঁকা, তার জন্য রঙ মেশানোর পালা কবে শুরু হয়েছিল, কে খবর রাখে? আজ পৃথিবীর সন্তান আত্মপরিচয়ের সন্ধানে যাত্রা করেছে, হাজার রূপের আড়াল থেকে নিজের স্বরূপকে সে চিনে নিতে চায়। চেতনার স্ফুরণ ঘটেছে, – তাই চেতনার উৎসের খোঁজে সে উন্মুখ। জড় থেকে জীব, প্রাণ থেকে মহত্তর প্রাণ, হাজার হাজার রঙে লক্ষ লক্ষ আলপনা আঁকা হয়ে আসছে আজ চারশো কোটি বছর। আধুনিককালের হলোসীন পর্যায়ে সেই প্রাণের ধারা মানুষের রূপ নিয়ে নিজেকে নিজেই ফিরে দেখতে চায় – এ এক আশ্চর্য বিরাট সেল্‌ফি। এই সীমাহীন উপন্যাসে আর কোনো পাত্র-পাত্রী নেই, কেউ যেন নিজে হাতে কলম ধরে নিজের অবিরাম জন্মকাহিনী নিজেকেই শুনিয়ে চলেছে।
 
 
” মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হত অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;
দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়–
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়। “

 
 
* * * 
 
ডাঙার পরিবেশে গাছের নতুন অভিযোজন দারুণ রকম সাফল্য পেয়েছিল। প্রথমদিককার এই গাছদের মধ্যে ছিল ছোটো চেহারার Cooksonia, ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ওয়েল্‌সে এর ফসিল পাওয়া যায়। ছিল আরো একটু জটিল গঠনের Baragwanathia, ‘পাতা’ দেখা গেল এর গায়ে, তার মধ্যে নলবিন্যাসও পাওয়া গেল। এদের সময়কালের নাম Silurian period। সিলুরিয়ান পর্যায়, মনে রাখার মতো নাম – ডাঙার সফলভাবে প্রাণের বিস্তার ঘটল এই পর্যায়েই। প্রথম সফল স্থলজ গাছ তো এলই, প্রথম ডাঙার প্রাণীও এল সিলুরিয়ানে। তার কথা আমরা জানলাম দু’হাজার চার সালে, মাইক নিউম্যান নামে এক বাস ড্রাইভারের দৌলতে।
 
 
মাইক নিউম্যান বাস ড্রাইভার হলেও শখের জীবাশ্মবিদ। ২০০৪ সালে স্কটল্যাণ্ডের স্টোনহ্যাভেনের কাছে বেলেপাথর ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে একটা এক সেন্টিমিটার লম্বা ফসিলের টুকরো খুঁজে পায়। কেন্নোর মতো চেহারা, ৪২৮ মিলিয়ন বছর আগেকার প্রাণী। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে এই প্রাগৈতিহাসিক কেন্নো থেকে যা জানা গেল তা মোটামুটি এই: এক, এটা একধরনের millipede, ‘সহস্রপদী’ কেন্নো। দুই, নিউম্যানের আবিষ্কৃত কেন্নো সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম স্থলচর জীব। তিন, শুধু স্থলচর জীবই নয়, এই কেন্নোর শরীরে যে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল তার স্পষ্ট চিহ্ন ফসিলে আছে – কাজেই এ প্রথম অক্সিজেনপায়ী স্থলচর জীবও বটে। বাতাসে শ্বাস নেবার যন্ত্র পাওয়া গেল বলেই বরং আরও নিশ্চিত হওয়া গেল যে এ জলের বাসিন্দা নয়। নিউম্যানের সম্মানে এই কেন্নোর নাম রাখা হল Pneumodesmus newmani, ‘শ্বাস-নেওয়া কেন্নো যাকে নিউম্যান খুঁজে পেয়েছিল’। দশ মিলিয়ন বছর পরে নিউমোডেসমাসের জাতভায়েরা তার মিলিয়ন-পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডাঙায় উঠে আসে, সেটা Devonian period। আর প্রথম যে মেরুদণ্ডীরা ‘মাছ’ থেকে বদলে ‘উভচর’ হয়ে গুটিগুটি জল থেকে উঠে এসেছিলো, আমাদের সেই পূর্বপুরুষ নিউমোডেসমাসের চেয়ে পাক্কা পাঁচ কোটি বছরের ছোট।
 
 
‘টোকা দিলে টাকা হয়’ যে কেন্নো, সে-ই প্রথম বশ করেছিল শুকনো ডাঙার পৃথিবীকে। ‘পৃথিবীটা কার বশ’, এর পরে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না।
 
পরে যারা ডেভোনিয়ান যুগে মাটিতে উঠে এল, তারা ছিল centipede, মিলিপীড নয়; কেন্নো বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তা মিলিপীডই, সেন্টিপীডের উদাহরণ হল আমাদের তেঁতুলবিছে। সেন্টিপীড শিকারী মাংসাশী; মিলিপীড নিরামিষাশী, শান্তশিষ্ট, হাতে তুলে নিলেও কিছু বলে না। সিলুরিয়ান কেন্নোরাও সেরকমই হবার কথা। কিন্তু একধরনের শিকারী মাকড়শার ফসিল পাওয়া যায়, যারা সিলুরিয়ানেই বেঁচে ছিল, সম্ভবত নিউমোডেসমাসের পাশাপাশি। এ থেকে একধরনের খাদ্য-খাদক সম্পর্ক বা food web-এর সম্ভাবনা আঁচ করা যায়। এই আদিম মাকড়শারা পরে আরও বিবর্তিত হয়েছিল, কার্বনিফেরাসের জঙ্গলে এদের দেখা পাওয়া যেত। দেখতে অনেকটা আধুনিক ট্যারান্টুলাদের মতো। জাল বা রেশম বোনার ক্ষমতা এদের ছিল না, হেঁটে বেড়িয়ে খাবার ধরতে হত। এদের হাঁটার চলন কেমন ছিল, তার একটা মডেল বিজ্ঞানীরা গতবছর কম্পিউটার গ্রাফিক্সে তৈরী করেছেন।
 
.
.
.
.
.
 
সিলুরিয়ান বহু ‘প্রথম’-এর যুগ। সমুদ্রে আধুনিক মাছেরা দেখা দিল এই সময়। আধুনিক বলতে – চোয়ালওয়ালা, ইংরেজীতে gnathostomata, g-টা সাইলেন্ট। প্রথমদিকে সিলুরিয়ান পর্যায়ের সমুদ্রে চোয়ালবিহীন মাছেদের প্রাচুর্য ছিল, আজকের দিনের হ্যাগফিশ বা ল্যামপ্রে জাতীয় মাছের মতো। তার কিছু পরে, মাঝ-সিলুরিয়ান বরাবর, প্রথম চোয়াল দেখা গেল। বছর দুয়েক আগে চীনে একদল গবেষক এক মাছ-ফসিল খুঁজে পান, তার মাথায় এইরকম প্রাথমিক চোয়াল পাওয়া যায়। ‘মুখ’ বলতে আমরা যে জিনিসটা বুঝি, তার আদলটা এল এইভাবে। This was the face that launched a thousand faces. ল্যাটিনে নামটা Entelognathus primordialis, সরাসরি বাংলা করলে সাদা অর্থ দাঁড়ায় ‘আদিম সম্পূর্ণ-চোয়ালওয়ালা মাছ’। ল্যাটিনে অবশ্য ‘মাছ’ কথাটার উল্লেখ নেই। যেসময়ের কথা, সেসময় মাছ ছাড়া আর মেরুদণ্ডী প্রাণী ছিলই বা কী?
 
 
শুধু চোয়ালেই থামল না, সিলুরিয়ানে ন্যাথোস্টোমাটারা আরও দুইভাগে ভাগ হয়ে গেল। একভাগ গেল কার্টিলেজের দিকে, আর এক ভাগ এল হাড়ের দিকে। শরীরে কঙ্কালের প্রধানতঃ এই দুই উপাদান: শক্ত হাড়, আর নমনীয় কার্টিলেজ। আমাদের শরীরে হাড়ের গুরুত্ব বেশী, কার্টিলেজ কম। কিন্তু এমন প্রাণী আছে যাদের কঙ্কাল কার্টিলেজ দিয়ে তৈরী, হাড় দিয়ে নয়। হাঙর আর শঙ্করমাছেরা এই দলে পড়ে। এই বিভাজনটা দেখা দিয়েছিল সিলুরিয়ানে। একদিকে রইল কার্টিলেজওয়ালা মাছেরা, আর একদিকে রইল হাড়ের কাঁটাওয়ালা মাছেরা, যাদের থেকে পরে ডাঙার উভচর-সরীসৃপ-পাখি-স্তন্যপায়ীরা উদ্ভুত হবে। 
 
সিলুরিয়ান সমুদ্রের সত্যিকারের দাপুটে বাসিন্দা কিন্তু এইসব মাছেরা ছিল না। আসল শাসনদণ্ড ছিল অমেরুদণ্ডীদের হাতে। 
 
একধরনের সামুদ্রিক কাঁকড়াবিছে সেসময় সমুদ্রের apex predator ছিল। এরা পৃথিবীর সর্বকালের সর্ববৃহৎ ‘পোকা’, – সবচেয়ে বড় যে ফসিল পাওয়া গেছে তার দৈর্ঘ্য আড়াই মিটার, – মানে একটা কুমীরের সমান লম্বা। সবাই এরকম রাক্ষুসে আকারের হত না, গড় সাইজ অনেকটাই কম ছিল। শিকার করার মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভালোরকমই ছিল, সাঁতার যদিও কাটতে পারত, তবু সমুদ্রের মেঝেতে পায়ে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যেসই বেশী ছিল। শিকারের মধ্যে পড়ত নরম কৃমি বা কেঁচো জাতীয় প্রাণী। পূর্ণবয়স্ক বিছেরা ডিম পাড়ার সময়ে গভীর সমুদ্র থেকে তীরবর্তী অঞ্চলের দিকে চলে আসত, সেখানেই সঙ্গম আর তার পরে ডিম পাড়ত। তখনকার জীবজগৎ প্রধানত সামুদ্রিক, ডাঙা প্রায় ফাঁকা, শিকারী পশুপাখির সম্ভাবনা নেই, তাই বাচ্চাদের জন্য সেরকম জায়গা মাঝসমুদ্রের চেয়ে অনেক বেশী নিরাপদ। বাচ্চারা বড় হয়ে আবার সাঁতরে সমুদ্রের গভীরে ফিরে যেত, বিয়ের বয়স হলে আবার বীচের দিকে আসত – ‘হনিমুন’ সারতে। প্রজননের সময় পুরোনো খোলস ছাড়া এদের স্বভাব ছিল, যে স্বভাব আধুনিক horseshoe crab-দের মধ্যে দেখা যায়। ‘আধুনিক’ কথাটা বলা ভুল হল। হর্সশু ক্র্যাব যে living fossil, লোপ-না-পেয়ে টিকে থাকা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী! ওই কাঁকড়াবিছেদের পাশাপাশি তারাও সিলুরিয়ান সমুদ্রের অধিবাসী ছিল। 
 
 
ডাঙায় গাছেরা উঠে আসার ফলে একটা ব্যাপার হল, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়তে লাগল। পরিমাণটা যখন ১৩%-এর কাছাকাছি দাঁড়াল, তখন বায়ুমণ্ডলে ‘দাহ্য’ গুণটা ভালোরকম প্রকাশ পেল। আজ থেকে চারশো কুড়ি মিলিয়ন বছর আগে সিলুরিয়ানের শেষভাগে জ্বলল প্রথম দাবানল। কাঠকয়লার সেই হল প্রথম উৎপত্তি। কাঠ পুড়ে শুধু কার্বনের খোলসটা পড়ে রইল, বাকি অংশ বাষ্প হয়ে উবে গেল। শুকনো পিওর কার্বন কোনো জানোয়ার খায় না, সহজে সংরক্ষিত হয়। এইভাবে অনেক পুরোনো গাছেরা কাঠকয়লা হয়ে ফসিল হবার সুযোগ পেয়েছে।
 
সিলুরিয়ান পেরিয়ে ডেভোনিয়ান এলো, উভচর অ্যাম্ফিবিয়ানদের উত্থানের সাক্ষী ডেভোনিয়ান পিরিয়ড। তার পরে কার্বনিফেরাস।
 
 
 কার্বনিফেরাস পর্যায়ে যে বিরাট বিরাট মস (শ্যাওলা), সাইকাড আর ফার্নের বন তৈরী হয়েছিল, তা সম্ভব হয়েছিল গাছের গায়ে নল-ব্যবস্থা থাকার জন্যই। পৃথিবীর অনেকটা জুড়ে এদের জঙ্গল ছড়িয়ে ছিল। এখনকার ম্যাপে সেসব জায়গার বেশীরভাগই অ-জঙ্গুলে জায়গা, কেউ দেখে বলবে না সেখানে একসময় ঘন বন ছিল। চিহ্ন পাওয়া যায় শুধু কয়লাখনির উপস্থিতি দেখে। একসময় বিশাল বনভূমির অস্তিত্ব না থাকলে তো কয়লাখনি তৈরী হতে পারে না। এই পর্যায়ের নাম সেইজন্যেই কার্বনিফেরাস, – carbo = কয়লা, fero = বহন করা, – মানে ‘কয়লাবাহী’ পর্যায়। এই সময়কার পৃথিবীর ম্যাপ অন্যরকম, Pangaea নামে যে অতিকায় মহাদেশ ছিঁড়ে আমাদের আজকের সাত মহাদেশের জন্ম, সেই প্যানজিয়ার তখন গড়ে ওঠার পালা চলছে। আমেরিকায় (তখনো আমেরিকা হয়নি) অ্যাপালেশিয়ান পর্বতমালা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, হিমালয়ের চিহ্ন নেই, সবেমাত্র টেথিস সাগরের চেহারাটা যেন খানিকটা আঁচ করা যাচ্ছে। আবহাওয়া উষ্ণ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ভাগ বেশী, গাছের খাবারের জোগান অফুরান, বড় বড় জলা-জঙ্গলে তখনকার ইউরোপ আমেরিকা ঢাকা। 
 
সেইসব বন শুধু সবুজের বন। গাছেরা তখন সবে কাণ্ড আর পাতা বানিয়ে উঠতে পেরেছে, ফুল ফল তখনো আসেনি, এমনকী ‘কাঠ’ও সবার ঠিকমতো তৈরী হয়নি। গায়ে শুধু একধরনের বাকল হত। আধুনিক গাছের মতো চেহারার সিজিলারিয়া, লেপিডোডেনড্রন আর কালামাইটস, বিশাল সমস্ত মস আর হর্সটেইল গাছ, কুড়ি তিরিশ মিটার উঁচু বড় বড় ফার্ন, সাইকাড, সবচেয়ে পুরোনো যে জাতের ট্র্যাকিওফাইট গাছ এখনও বেঁচে আছে – সেই লাইকোপড, – এদের নিয়ে তৈরী হয়েছিল কার্বনিফেরাসের জঙ্গল। ফার্নগাছ আমরা চিনি, বর্ষাপ্রধান বনের ঝোপেঝাড়ে, বড় গাছের গোড়ায় গোছায় গোছায় এদের দেখা যায়। সবুজ চেহারা, একেকটা বোঁটায় মাঝের একটা অক্ষের দুপাশে সারি দিয়ে ছোটো ছোটো পাতা সাজানো, – নিমপাতার সজ্জা যেমন হয়, অনেকটা সেরকম। ফ্লোরিস্টদের কাছে এর কদর খুব – ফুলের তোড়া সাজাতে তারা এগুলো ব্যবহার করে। এই সবুজ অংশগুলো আসলে ঠিক ‘পাতা’ নয়, ঝালরের মতো চেহারার এই প্রায়-পাতাদের বলে frond। সেকালের ফ্রন্ড-ওয়ালা ফার্নরা বড় বড় তালগাছের মতো লম্বা হত। জুরাসিক পার্ক বানানোর সময় জন হ্যামন্ড ডাইনোসরদের পাশাপাশি প্রাগৈতিহাসিক গাছপালারও ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ডাইনোরা তাদের পরিচিত খাবার পায়।
 
গাছেরা ডাঙার জীবজগতের ভিত্তি। এখানেও সেই জিনিস দেখা গেল। অফুরন্ত সবুজের কল্যাণে বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব বেড়ে গেল, আর তার সুযোগ নিল নানারকম পোকামাকড়। সেন্টিপীডরা তো ডেভোনিয়ানেই ডাঙায় উঠে এসেছিল। প্রচুর অক্সিজেন পেয়ে তারা এবার আকারে বাড়তে শুরু করল। ছ’ফুট লম্বা কেন্নো Arthropleura – আজ অবধি ডাঙায় এত বড় পোকা আর হয়নি। তিন ফুট সাইজের বড় বড় কাঁকড়াবিছে, অতিকায় আরশোলা, – কার্বনিফেরাসে এরাই ছিল জঙ্গলের রাজা। তিনশো কুড়ি মিলিয়ন বছর আগেকার একরকমের ফড়িঙের ফসিল পাওয়া গেছে, ডানা ছড়ালে তার সাইজ দাঁড়াত আড়াই ফুট, – ছোটোখাটো একটা গাঙচিলের মতো। এই প্রাগৈতিহাসিক ফড়িঙের নাম Meganeura, এ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডানাওয়ালা পতঙ্গ। – এই যে কীটপতঙ্গের এত বাড়বাড়ন্ত, তার পেছনে যেমন অক্সিজেনের একটা বড় ভূমিকা ছিল, তেমন এই সুবিধাও ছিল যে পোকা আর উভচর বাদে খুব বেশী জীববৈচিত্র সে আমলে ডাঙায় ছিল না। উভচররা উড়তে পারে না, আর স্যাঁতসেঁতে জায়গা ছাড়া থাকতেও পারে না। পোকাদের রাজত্ব অনায়াসে কায়েম হল। 
 
পতঙ্গরা কীভাবে প্রথম উড়তে শিখল, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ওদের হাত ধরেই তো প্রাণীদের প্রথম আকাশ জয়। একটা সম্ভাবনা হতে পারে – হয়তো নিজেদের তাপমান নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে পোকারা তাদের শরীরে পাতলা, ছড়ানো ধরনের কোনো প্রত্যঙ্গ তৈরী করেছিল। পোকারা যেহেতু এক্টোথার্মিক, তাই শরীর গরম রাখার জন্য তাদের রোদের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। ছড়িয়ে থাকা অঙ্গ মানে তার ক্ষেত্রফল বেশী, বেশী করে রোদ নিয়ে তা তাড়াতাড়ি তাপের জোগান দিতে পারে। পরে হয়তো এই ছড়ানো অংশই পাখা হয়ে উঠেছিল। কার্বনিফেরাস বড় গাছের জঙ্গলের যুগ, এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে যেতে গেলে পাখার মতো অংশ বাড়তি সুবিধা দিত – হতেই পারে। গাছের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রাণীদের বিবর্তন সমানতালে এগিয়ে চলল।
 
 
এদিকে ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো মহাদেশ জোড়া লেগে প্যানজিয়া তৈরী হল, আর তার প্রভাব পড়ল সামুদ্রিক জীবজগতে।
 
 
টুকরো মহাদেশরা যতদিন আলাদা আলাদা ছিল, ততদিন প্রত্যেক ভূখণ্ডের চারপাশে সমুদ্র ঘিরে থাকার দরুণ অনেকটা পরিমাণে উপকূল অঞ্চল ছিল। এবার যখন এরা কাছাকাছি এসে জোড়া লাগতে আরম্ভ করল, তখন দেখা দিল বিপদ। জোড়া-লাগার বর্ডার বরাবর সমস্ত উপকূল সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, – জল থেকেই আলাদা হয়ে গেল। আগে যা ছিল একজোড়া সমুদ্রতীর, তা বদলে হল একটানা বিস্তৃত ডাঙা। এর ধাক্কায় অনেক সামুদ্রিক প্রজাতি লোপ পেল। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপর্যয় আসছিল অন্য দিক থেকে। হাজার হাজার বর্গমাইল বনভূমির ক্রমাগত সালোকসংশ্লেষের ফলে বাতাসে অক্সিজেন হু-হু করে বাড়ছিল।
 
আমাদের স্কুলে ‘গ্রীনহাউস গ্যাস’ বলে কিছু গ্যাসের কথা পড়ানো হয়। কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয় বাষ্প, মিথেন, ওজোন – এরা এই দলে পড়ে। ‘গ্রীনহাউস’ কথাটার পেছনে কারণ আছে। শীতপ্রধান দেশে যারা বাগান করে, তাদের অনেকসময় ঠাণ্ডার হাত থেকে গাছ বাঁচানোর জন্য গ্রীনহাউস বলে একধরনের ঘর ব্যবহার করতে হয়। আগাগোড়া কাঁচ দিয়ে তৈরী ঘর, দেওয়াল-সীলিং সবই স্বচ্ছ কাঁচের। সূর্যের আলো এর ভেতরে ঢোকে, কিন্তু বেরোবার সময় সমান তেজ নিয়ে বেরোতে পারে না, খানিকটা এনার্জি ঘরের ভিতর রেখে যায়। এই তাপ আটকে রাখাকে বলে heat trapping। এর ফলে বাইরের চেয়ে গ্রীনহাউসের ভিতরের তাপমান খানিকটা বেশী হয়, শীতের সময় গাছকে নিরাপদে সূর্যের আলোয় রাখা যায়। 
 
 
গ্রীনহাউস গ্যাস যারা, তাদেরও এরকম ধর্ম থাকে। সূর্যের কিরণ আমাদের বায়ুস্তরে ঢুকে পৃথিবী স্পর্শ করে আবার ফিরে যায়, কিন্তু বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্রীনহাউস গ্যাসেরা এই ফিরতি এনার্জির সবটুকু পৃথিবীর গা থেকে মহাকাশে ছড়িয়ে যেতে দেয় না। খানিকটা শুষে নিয়ে আবার পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেয়। পৃথিবী ঠাণ্ডা হওয়া থেকে বাঁচে। দেখা গেছে, বাতাসে গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ সময়ের সাথে সাথে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। কখনো বেড়ে যায়, কখনো খুব কমে যায়। অবশ্য এই বদলটা এত দীর্ঘ সময় ধরে হয় যে আমাদের সাধারণ চোখে তা কোনো প্যাটার্ন নেয় না। আড়াইশো বছর আগে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হল, আর তার পর থেকে আমাদের ‘বায়ুদূষণ’ বেড়ে গেল। এখন এসে ঠেকেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ। মানুষের কাছে এটা নিঃসন্দেহে একটা প্রলয়ঙ্কর ব্যাপার। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এটা কোনো নতুন কথা নয়। বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীর দু’রকম দশা আছে – একটা হল greenhouse earth বা hothouse earth, আর একটা হল icehouse earth; তাপঘর আর হিমঘর। যদি এমন অবস্থা থাকে, যে পৃথিবীর ওপর অতিকায় বরফের স্তর বা continental glacier লক্ষ্য করা যাচ্ছে – যেমন আমাদের অ্যান্টার্কটিকা কিংবা আর্কটিক – তাহলে তখন সেই দশাকে বলা হবে আইসহাউস আর্থ। আর যদি ওরকম মাপের বিশাল বরফের আস্তরণ বা গ্লেসিয়ার কোথাও না থাকে, তাহলে তাকে বলা হবে গ্রীনহাউস আর্থ। আজ অবধি পৃথিবী গ্রীনহাউস হয়েই বেশীরভাগ সময় কাটিয়েছে। ভাবতে কষ্ট হয়,- এখন যেটা চলছে সেটা পৃথিবীর সদ্যতম হিমযুগ,- আমরা আইসহাউজ দশার প্রাণী। দেখে মনে হয় না যদিও; কিন্তু উত্তরে দক্ষিণে দুই মেরুতে দুই বরফে ঢাকা মহাদেশ এর অকাট্য প্রমাণ। তাছাড়া, আমরা যে আইসহাউসে রয়েছি, তার একটা পরোক্ষ প্রমাণও আছে।
 
‘Ice Age’ সিনেমার কথা মনে আছে? ২০০২-এর সিনেমা, বেস্ট অ্যানিমেটেড ফিচারের জন্য অস্কারে গিয়েছিল। অস্কার পায়নি, কিন্তু অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল – ঊলি ম্যামথ ম্যানফ্রেড, ছোরাদেঁতো বাঘ ডিয়েগো, গ্রাউন্ড স্লথ সিড, আর দাঁতালো কাঠবেড়ালী ‘স্ক্র্যাট’। সেই ছবিতে দেখেছিলাম, প্রাচীন মানুষ দল বেঁধে বল্লম হাতে ম্যামথ শিকার করতে বেরোত। বাস্তবে যে প্রমাণ মেলে তাতেও দেখা গেছে, আজ থেকে আন্দাজ ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার মানুষের যে পূর্বপুরুষ, Homo erectus, তারা ম্যামথের মাংস খেত। শিকার করে, না আগে থেকে মরা ম্যামথের দেহের সদ্ব্যবহার করে – তা ঠিক পরিষ্কার নয়। আরো পরের দিকে Neanderthal মানুষরা মাংসের জন্য ম্যামথ শিকার করত, সেই মাংস কেটেকুটে রান্না করে খেত। ৫০,০০০ বছর আগেকার ম্যামথের হাড়ে অস্ত্রাঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে। ম্যামথের হাড় দিয়ে আদিম মানুষ ঘর বানাতেও শিখেছিল। আর শিখেছিল কিছু কিছু অস্ত্র বানাতে। এসব প্রয়োজনের জিনিস ছাড়াও, ম্যামথের হাড় আর দাঁত দিয়ে পুরোনো মানুষরা নানারকম শখের জিনিসও তৈরী করত। 
 
ম্যামথের দাঁত দিয়ে তৈরী জিনিস – শুনে অবধারিতভাবেই হাতির দাঁতের কথা মনে পড়ে। ম্যামথ প্রাগৈতিহাসিক হাতি ছাড়া আর কী? – হয়তো একভাবে কথাটা ঠিক, কারণ ম্যামথ আর আধুনিক হাতির ফ্যামিলি এক – Elephantidae। কিন্তু একটা কথা ভুল করে প্রায়ই ভাবি, যে ম্যামথ হাতির পূর্বপুরুষ। আসলে তা নয়। ম্যামথের সাথে হাতির সম্পর্ক পিতা-পুত্রের নয়, বরং অগ্রজ-অনুজের। হাতি আর ম্যামথ সহোদর প্রজাতি। আন্দাজ পাঁচ মিলিয়ন বছর আগে, Primelephas নামে একধরনের শুঁড়ওয়ালা প্রাণী পৃথিবীতে বেঁচে ছিল। শুঁড় ছিল, বড় বড় কান ছিল, থামের মতো বিশাল পা ছিল, আর ছিল – দুটো নয় – চারটে লম্বা গজদাঁত। এই চেহারা আমাদের কাছে নতুন নয়, পীটার জ্যাকসনের দৌলতে একে আমরা রূপোলী পর্দায় অনেকদিন হল চিনেছি। মরডরের ব্ল্যাক গেটের কাছে গিরিখাতের আড়ালে বিশ্রাম নেওয়ার সময় স্যাম গ্যামগী একটা ছড়ায় গলামকে তার পরিচয় শুনিয়েছিল –

Oliphaunt

Grey as a mouse,
Big as a house,
Nose like a snake,
I make the earth shake,
As I tramp through the grass;
Trees crack as I pass.
With horns in my mouth
I walk in the South,
Flapping big ears.
Beyond count of years
I stump round and round,
Never lie on the ground,
Not even to die.
Oliphaunt am I,
Biggest of all,
Huge, old, and tall.
If ever you’d meet me
You wouldn’t forget me.
If you never do,
You won’t think I’m true;
But old Oliphaunt am I,
And I never lie.

 
হবিটদের ছড়ায় এর নাম ছিল অলিফন্ট, কিন্তু বিজ্ঞানীরা একে নাম দিয়েছেন প্রাইমএলিফাস, – ‘প্রথম হাতি’। ৫ মিলিয়ন বছর আগে প্লিওসীন অধ্যায়ে প্রাইমএলিফাসদের থেকে দুটো শাখা বেরিয়ে আসে, তার একটা আবার দু’ভাগ হয়। একটা শাখা থেকে উঠে আসে Loxodonta – আফ্রিকান হাতি, আর আরেকটা শাখা দুভাগ হয়ে একদিকে উঠে আসে Mammuthus, আর একদিকে আমাদের Elephas – ভারতীয় হাতি। এই তিন শাখার মধ্যে ম্যামথরা কয়েক হাজার বছর আগে বিদায় নিয়েছে, বাকি দুই প্রজাতি এখনও অবধি জীবিত। 
 
‘Mammuthus’ জীনাসের মধ্যে অনেক প্রজাতি ছিল, সবাইকেই আমরা চলতি কথায় ম্যামথ বলি। এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ যারা, সেই ঊলি ম্যামথরা আদিম মানুষের সমসাময়িক ছিল। ‘ঊলি’ কেন? কেননা বড় বড় ঘন লোমে এদের শরীর ঢাকা ছিল, শীত থেকে বাঁচার জন্য। আমাদের সাধারণ গরু আর হিমালয়ের চমরী গাইয়ের মধ্যে ঠিক এই তফাত দেখা যায়। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সব ম্যামথের tusk (গজদাঁত) থাকত, আর আকৃতিও হাতিদের থেকে বড়ই হত, মাটি থেকে কাঁধ প্রায় চার মিটার উঁচু, ওজন আট-নয় টন। এমনকী বারো টনের ম্যামথও পাওয়া গেছে। এই বিশাল চেহারার একটা বড় অংশ ছিল ফ্যাট। ঠাণ্ডার প্রাণী হিসেবে ম্যামথরা দেহে চর্বি জমিয়ে রাখত, অভাবের সময় সেই চর্বি ভাঙিয়ে শরীরের কাজ চলত। 
 
উত্তর মেরুর সাদা ভালুকদের মধ্যে এখনও এই অভ্যেস দেখা যায়। ওদের সন্তানপালন এর সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে। ওদের ওখানে কার্যত বারো মাসই শীত, তার মধ্যেও বসন্ত পেরিয়ে যখন গরমকাল পড়ে, ধূ-ধূ বরফের দেশে কোনোমতে শিকার জোটানো সেইসময় সবচেয়ে সহজ হয়। এপ্রিল-মে নাগাদ সীলদের দল তাদের পছন্দমতো জায়গায় ডেরা বাঁধে, আর তাদের খোঁজে এসে হাজির হয় মেরু ভালুকরা। পছন্দসই সঙ্গী খুঁজে নিয়ে তারা জুটি বাঁধে। সপ্তাহখানেক বর-বউ একসাথে থাকে, তার পর থেকে মেয়ে ভালুক মাতৃত্বের জন্য তৈরী হওয়া শুরু করে। দেখতে দেখতে শীতকাল চলে আসবে, শিকার জোটানো অসম্ভব হবে, বাচ্চাদের খাবার না দিলে তো তারা বাঁচবে না। ঠাণ্ডাতেও মারা যাবে। শীতকালে বাচ্চাসহ মায়ের ঘরের বাইরে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাই মে থেকে সেপ্টেম্বর – এই চার মাসে মা ভালুক যতটা পারে খাবার খেয়ে শরীরে চর্বি মজুত করে। ওজন বেড়ে যায় অনেকটা, প্রায় দুশো কেজি বাড়তি ভার জমে মায়ের শরীরে। তারপর যখন বছরের শেষ দিকে তাপমান কমতে শুরু করে, তখন মা বরফের ভিতর গর্ত খুঁড়ে গুহার মতো বানিয়ে নেয়। শীতকালটা তার এখানেই কাটবে। টানা আট মাস সে আর বাইরে বের হবে না।
 
শীতের ঠিক মাঝামাঝি, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে, বাচ্চা ভালুকরা জন্মায়। ওজন এক কেজিও নয়, হালকা লোমে গা ঢাকা, – একেবারেই ছোটো অসহায়। মা তাদের নিজের শরীরের তাপে গরম রাখে, অল্প অল্প করে ফ্যাট-সমৃদ্ধ দুধ খাওয়ায়, চার মাস ধরে একটু একটু করে তাদের বড় করে তোলে। মাঝ-এপ্রিলের দিকে যখন গর্তের মুখের বরফ ভেঙে মা বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে আসে, তখন ওদের ওজন দশ-পনেরো কেজি, দিব্যি হেঁটে চলে বেড়ানোর বয়স হয়েছে। মা ভালুক এই আট মাস টানা উপোসী থেকেছে, একটিবারের জন্যেও হাত-পা ছড়ায়নি, গর্ত ছেড়ে বেরোয়নি। এতদিন পরে বাইরে এসে সে খুশিতে বরফে গড়াগড়ি দেয়, বাচ্চারা মায়ের সাথে খেলায় মাতে। কিন্তু তাদের ভালুক হওয়া এখনো বাকি। মা রোগা হয়ে গেছে, অভুক্ত পেটে খিদে, দুর্বল শরীর। খাবার জোটানো প্রথম কাজ। মায়ের সাথে পায়ে পায়ে তারা এবার শিকার শিখতে বেরোয়। 
 
ম্যামথদের সন্তানপালনে চর্বির এরকম আলাদা কোনো ভূমিকা থাকত কিনা, জানিনা। কিন্তু একটা ব্যাপার পরিষ্কার। ঊলি ম্যামথ নিশ্চিতভাবেই হিমযুগের প্রাণী, যে হিমযুগ মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেও স্পষ্ট ছিল। এখন সে বরফ অনেকটাই কমেছে ঠিকই, কিন্তু ওয়ার্ল্ড ম্যাপের ওপরে আর নীচে ওই দুটো সাদা ছোপই সাক্ষ্য দিচ্ছে, পৃথিবী এখনও আইসহাউস। এরকম আইসহাউস দশা চলাকালীন কন্টিনেন্টাল গ্লেসিয়ারদের আকার বাড়তে-কমতে পারে, কখনো বেড়ে এগিয়ে আসে, কখনো কমে পিছিয়ে যায়, কিন্তু একেবারে নিশ্চিহ্ন হয় না। তেমন হলেই আর তাকে আইসহাউস আর্থ বলা যাবে না। এখন আমাদের বরফগলার পালা চলছে, হিমবাহরা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে, অ্যান্টার্কটিকায় ice shelf খসে যাচ্ছে, সমুদ্রের জলতল ক্রমশ বাড়ছে। পৃথিবী সম্ভবত তার হিমঘর দশা কাটিয়ে উঠছে। ‘গ্রীনহাউস এফেক্ট’-এর নাম তো আজ ঘরে ঘরে জানা।
 
 
মোটের ওপর নিয়মটা দেখা গেল – বায়ুমণ্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাস যত বেশী হবে, পৃথিবী তত সহজে গরম থাকবে। যদি এর মাত্রা কমে যায়, তাহলে তাপ বিকীর্ণ হয়ে ছড়িয়ে যাওয়ার হার বেড়ে যাবে, পৃথিবীর তাপমান নেমে আসবে। কার্বনিফেরাসের বন-কে-বন গাছপালা ক্রমাগত CO₂ শুষে নিয়ে অক্সিজেনে বাতাস ভরিয়ে তোলার ফলে ঠিক তাই হল।
 
বাতাসে তখন ৩৫% O₂, – এত বেশী অক্সিজেন পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো বায়ুমণ্ডলে জমেনি। পৃথিবী দ্রুত শীতল হতে লাগল, সেইসাথে সামগ্রিক আর্দ্রতাও কমে এল। প্যানজিয়ায় দেখা দিল হিমযুগ। অনেকখানি অঞ্চল বরফে ঢেকে গেল, ভেজা-ভেজা গরমের দিনকাল বদলে গিয়ে এল শুকনো, ঠাণ্ডা আবহাওয়া। বিশালকায় ফার্ন-মসের বাদলবনেরা এই পরিবর্তন সহ্য করতে পারল না। অধিকাংশ লোপ পেল, যারা বাঁচল তারা টুকরো টুকরো হয়ে এদিকে ওদিকে টিকে রইল। সেই একটানা নিরবিচ্ছিন্ন সবুজ আর রইল না। প্রাগৈতিহাসিক বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে থাকা কার্বন গাছের শরীরে আশ্রয় নিয়েছিল, তার সেই সজীব ঘনীভূত রূপ মাটির নীচে চাপা পড়ে সময়ের সাথে সাথে নতুন পরিচয় পেল – কয়লা।
 
কার্বনিফেরাসের এই উপসংহারের নাম Carboniferous rainforest collapse। কিন্তু এই কাহিনীতে সত্যিকারের উপসংহার বলে কিছু নেই। কয়লাবাহী রেইনফরেস্ট নিজে শেষ হল বটে, কিন্তু সেই সাথে সাথে প্রাণের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে দিয়ে গেল। যে প্রাণীরা এতদিনে প্রথম আসরে নামল, তাদের নাম সরীসৃপ।
 
 
 
(চলবে)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s