বেনিয়াসহকথা – ১

আমার অনেকদিন আগেই হাজির হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু নানান গোলমালে দেরী হয়ে গেল। কেউ কেউ জানে, আমি এখন গোপন কাজে দেশের বাইরে। এক জটিল তদন্তের ভার আমার ঘাড়ে, আণ্ডারকাভার এজেন্ট হয়ে একটা ইস্কুলে মাস্টারীর কাজ নিয়েছি (‘টোয়েন্টিওয়ান জাম্প স্ট্রীট’ যে দেখেছে সে বুঝতে পারবে কেসটা কী)। এবার এই স্কুলে ঢোকা ইস্তক বিভিন্ন ধরনের ঘটনা, অঘটনা, দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে যেগুলো লিপিবদ্ধ করা মানে যাকে বলে নাগরিক জীবনের প্রাথমিক কর্তব্য, না করলে বিবেকবান মানুষ হিসেবে যে কেউ হীনন্মন্যতায় ভুগবে। কয়েকজনকে ফোনে গল্প করেছি, কিন্তু যে অগণিত মানুষের কাছে এগুলো পৌঁছচ্ছে না তাদের কী হবে? তাই আমার বন্ধুরা মিলে চাঁদা করে আমায় একটা জিওফাই থ্রী মোডেম কিনে দিয়েছে, আর বলেছে এসব যেন আমি লিখে পোস্ট করি।


প্রথম কয়েকদিনের বেশ কিছু হেভিওয়েট ঘটনা ছিল। আমি বাণীদির কাছ থেকে হেল্পও পেতাম, কিন্তু আজেবাজে কাজে সময় বেরিয়ে গেল বলে আমারই দেরী হল, তারপর দেখি সব রিপোর্ট বাণীদির অফিসে ফেরত চলে গেছে। আর পাওয়া যাবে না। তাই প্রথম কয়েকটা এপিসোড বাদ থাকছে। কমেন্টে যদি কেউ সীড করে তাহলে নামতেও পারে – জানিনা। আপাতত কাট টু দ্য প্রেজেন্ট।
————————————————————————–

ফাইভ-ঈ, মানে আমার ক্লাস। মানে আমি যে ক্লাসের ক্লাসটীচার। তেইশটি ক্ষুদ্র শিশু, তাদের অ-বাঙালী নামগুলো প্রথম প্রথম মনে থাকত না, এখন থাকে। এরা বড়ই ভালো, হালকা সিঙাড়ার ভিতরকার আলুর মত পবিত্র স্বভাব, কচি মটরশুঁটির মতো নির্মল সবুজ কৌতূহল, মুরগীছানার মতো সরল বাচাল চঞ্চলতা। এদের সঙ্গে আমার বেশ ভালো ফিট করে গেছে।
ইস্কুলের নিয়ম, টিফিনের সময় ক্লাসটীচারকে তার ক্লাসে বসে থাকতে হবে। তো কাল আমি গেছি। বাচ্চাগুলো টিফিনবক্স বার করে কেউ ফলমূল, কেউ রুটিসব্জী, কেউ আলুর পরোটা, কেউ সবুজ কচুরী – এইসব খাচ্ছে। এবার কাল হয়েছিল কী, আমার আঁকার বাই চেপেছিল। ক্লাস সিক্সে গুপ্ত সাম্রাজ্য পড়াতে গিয়ে মোটামুটি চেনাযোগ্য ভারতের ম্যাপ এঁকে ফেলেছিলাম বোর্ডে, তখনি সন্দেহ হয়েছিল। এবার আমার নিজের ক্লাসে টিফিন টাইমে বসে বসে কী করি? তাকিয়ে দেখি সাদা হোয়াইট বোর্ড একেবারে চাঁছাপোঁছা, তকতকে ফাঁকা। আমার পকেটে দুটো মার্কার। উঠলাম, উঠে কালো মার্কারটা (চিন্তা নেই, পার্মানেন্ট মার্কার নয়) বার করে বোর্ডের মধ্যিখানে বড়ো করে একটা ব্যাট-সাইন আঁকলাম। তারপর তার মাঝে ক্যাপিটাল লেটারে লিখলাম – ‘আর্কহ্যাম’।
ক্লাসে কিন্তু ততক্ষণে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। এই বালকবালিকারা দেখলাম শিক্ষিত, এসব চেনে। আমি ব্যাটসাইন এঁকেছি বলে সবাই সে কী খুশী! এবং সে কী তারিফ! নেহাত ইংরিজী বলছিল তাই, নাহলে ‘ক্যা-ব্বাত হ্যায়’, ‘শের হ্যায় শের’ – এইসব ভেসে আসত। আমি এত ভালো অডিয়েন্স পেয়ে উৎসাহের চোটে পাশে ছোট্ট করে গথাম সিটির স্কাইলাইন এঁকে ফেললাম, তার ওপরে গোল চাঁদ, চাঁদের গায়ে এক চিলতে মেঘের দাগ, আর একটা উড়ে যেতে থাকা বাদুড়। আমি আঁকছি আর পেছন থেকে সাধুবাদের বন্যা বয়ে চলেছে। তারপর ব্যাটসাইনটার একটা ডানার তলায় — পারব কি পারব না ইতস্তত করতে করতে এঁকেই ফেললাম, জোকারের মুখের একটা সাইড প্রোফাইল। আর তারপর তার উল্টোদিকে অন্য ডানাটার তলায় – এই জোকারটার দিকে মুখ করে তাকিয়ে – ব্যাটম্যান। এই শেষ ছবিটা আমার ঠিক মনঃপূত হল না, কিন্তু ততক্ষণে আমি মব্‌ড। ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আমাকে ঘিরে ধরেছে, চতুর্দিকে কাতারে কাতারে বাচ্চা। উৎসাহে সবাই প্রায় লাফাচ্ছে, প্রবল কিচিরমিচিরকলকাকলি স্যারস্যারস্যারস্যার শব্দ, আমি এক এক করে ঠাহর করার চেষ্টা করছি কে কী বলতে চায় তা শোনার, এমন সময় ধেয়ে এল সেই অমোঘ বারতা।
একসাথে দু’তিনজন মিলে দাবী করে বসল: স্যার ইউ আর ব্যাটম্যান।
আমি চাপ খেতে যাচ্ছিলাম কিন্তু খোদ বাইবেলে লেখা আছে – ‘আউট অফ দ্য মাউথ অফ বেবস অ্যান্ড সাকলিংস…’ – আমি শালা কে যে আমার আপত্তি খাটবে!
তবু একবার বলার চেষ্টা করলাম যে আমি ব্যাটম্যান একথা আমি একবারও বলছি না, কিন্তু আমাকে আর ব্যাটম্যানকে কেউ কখনো একসাথে একই ঘরে দেখেনি। এই কথা শুনে শিশুগুলি কিউ.ই.ডি. দেবার ভঙ্গিতে অধিকতর খুশীর সাথে পুনরায় ঘোষণা করল: স্যার ইউ আর ব্যাটম্যান!
তারপর আমার কণ্ঠস্বর তাদের আবিষ্কারের আনন্দে চাপা পড়ে গেল।…
পরে একটা প্রক্সি ক্লাস পেয়েছিলাম, আমারই পড়ুয়া সেকশন নাইন-এ তে। সেটায় যেটা হল সেটাও আমার কাছে ভালোরকম দামী। অনেকদিন ধরে চাইছিলাম – ওই সেকশনটায় একটা ভাঁটানোর মতো ফাঁকা পিরিয়ড। ফেব্রুয়ারী মাসে ওদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পড়া আছে, তাই মনে চুপি চুপি ইচ্ছে ছিল, একদিন ওদেরকে নিয়ে ওয়ার পোয়েট্রি পড়াব।
আমি ওদের ইংরিজী পড়াই না। আমাকে ইতিহাসের মাস্টার রেখেছে, ইতিহাসই পড়াই। কিন্তু ভাগ্যের ফের – আমাদের স্কুলে যাঁরা ইতিহাস পড়াতেন, তাঁরা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ইতিহাসের সীমারেখা হয় না। আমরাই ইতিহাস। আমাদের আজকালপরশুই ইতিহাস। আর এই গল্পের শুরু সিঙ্গুলারিটিতে, শেষ কোথায় কেউ জানে না। তাই যেখানে যেখানে মানুষের গল্প সালতারিখের কোটরে কোটরে মৌচাক হয়ে জমে আছে, যেখানে যেখানে রানারদের চিঠি কালো রাত্রির খামে এখনো প্রতীক্ষায় ঢাকা, যেখানে যেখানে মাটিচাপা ভালোবাসা এখনো ফুল ফুটিয়ে চলছে হাজার বছর কেটে যাবার পরেও, – সেই সব খানেই ইতিহাসের মাস্টারদের আনাগোনা লেগে থাকে। তাই আমার কলেজে পড়ার সময় কয়েকটা অদ্ভুত আশ্চর্য ভালো ক্লাসে যা পড়েছিলাম, খুব ইচ্ছে ছিল তা আমার এই গুটিকয়েক ছাত্রছাত্রীদের সাথে ভাগ করি। — রুপার্ট ব্রুক, উইলফ্রেড আওয়েন, সিগফ্রীড স্যাসূন… ব্যাটল অফ সম… আর সেই মারাত্মক, কালশিটে-পড়া কবিতাগুলো….
নীল চ্যানেল ফাইলটা বার করেই রেখেছিলাম আগে থেকে। এস.পি-র হাতে লেখা একটা শীটের ফোটোকপি পেয়েছিলাম আমরা। তার মধ্যে দুটো কবিতা আছে আমি জানতাম – ‘সুইসাইড ইন দ্য ট্রেঞ্চেস’, আর ‘ডালসে এট ডেকোরাম এস্ট’। হাতে করে সেই ফাইল নিয়ে গেলাম প্রক্সি ক্লাসে। ………..
বিশ্বযুদ্ধ, কিচনার আর্মি, সম অফেন্সিভ, স্যাসূন-আওয়েন পার করে কবিতার খাতা তুললাম যখন, তখন আমি বুঝতে পারছি আমার ক্লাস আমার সঙ্গে আছে। আমি যা বলছি, তার একটা কথাও মেঝেতে পড়েনি, একটাও ওপর দিয়ে বেরোয়নি। তারপর পড়লাম ‘সুইসাইড ইন দ্য ট্রেঞ্চেস’।
এরা নাইনের স্টুডেন্ট তো, বাইরে জল পড়ে না। কিন্তু আমিও যেহেতু একই পদার্থে তৈরী, তাই ক্লাসের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার বুঝতে কোনো কষ্ট হয়নি।
ওদের বললাম আমাকে দু’মিনিট সময় দিতে। ‘বিকজ আফটার রিডিং দিস আই নীড টু মিনিটস টু কমপোজ মাইসেল্ফ।’ কিন্তু আমি নিজের অ্যাডাল্টহুডকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম – দশ সেকেণ্ডে ভয়েস চলে এল। তারপর পড়লাম ‘ডালসে এট ডেকোরাম এস্ট’।
ক্লাস শেষ হবার আগে এটুকু বলার সুযোগ পেয়েছিলাম যে লড়াইশেষের মাত্র সাতদিন আগে উইলফ্রেড আওয়েন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান। তাঁর পকেটে একটা নোটবুক পাওয়া যায়। সেই নোটবুকে আওয়েনের হাতের লেখায় পাওয়া গিয়েছিল একটা কবিতার কয়েকটা লাইন। কবিতার বইটা আওয়েন সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, ক্যাম্পে অবসর সময়ে তাঁবুতে বসে সে বই পড়েছিলেন। আর প্রিয় কবিতার দুটো লাইন টুকে রেখেছিলেন নিজের নোটবইয়ে। আওয়েনের শেষ দিনগুলির সঙ্গী সেই কবিতার বইটার নাম ছিল “সঙ অফারিংস”, আর কবির নাম ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
(ক্রমশ)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s